টুয়েলভের আয়োজনে নকশী কাঁথার তারুণ্যের দৌড়

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, তারুণ্য ও সুস্থ জীবনধারাকে একসূত্রে গেঁথে রাজধানীর হাতিরঝিলে অনুষ্ঠিত হলো ‘নকশী কাঁথা ম্যারাথন’। নকশী কাঁথার নান্দনিকতা ও বাঙালির লোকজ ঐতিহ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এ ম্যারাথনে অংশ নেন প্রায় দেড় হাজার দৌড়বিদ। শুক্রবার ভোর ৫টায় শুরু হওয়া আয়োজনে ২, ৫ ও ১৫ কিলোমিটার, তিনটি ক্যাটাগরিতে দৌড়ান অংশগ্রহণকারীরা। ম্যারাথনটির আয়োজক ছিল এনএসইউ রানার্স এবং টাইটেল স্পন্সর ছিল দেশের অন্যতম ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড টুয়েলভ।
ভোরের আলো ফোটার আগেই হাতিরঝিলে জড়ো হতে শুরু করেন দৌড়বিদেরা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি। নির্ধারিত সময়ে দৌড় শুরু হলে হাতিরঝিলের সড়কজুড়ে তৈরি হয় প্রাণবন্ত পরিবেশ। বিভিন্ন বয়সের মানুষের পাশাপাশি তরুণদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দৌড়ের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, অন্যদিকে নকশী কাঁথার মতো বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পরীতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হয়।
আয়োজনটির মূল আকর্ষণ ছিল নকশী কাঁথাকে থিম হিসেবে গ্রহণ করা। বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত এই শিল্পকর্মের প্রতিটি নকশা ও সেলাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, প্রকৃতি, অনুভূতি ও সংস্কৃতির নানা গল্প। গ্রামীণ বাংলার নারীদের সৃজনশীল হাতে তৈরি নকশী কাঁথা দীর্ঘদিন ধরে এ দেশের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক ক্রীড়া আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে নকশী কাঁথাকে ভিন্ন এক পরিসরে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন আয়োজকেরা।
ম্যারাথনের টাইটেল স্পন্সর টুয়েলভের সঙ্গে নকশী কাঁথার এই সম্পৃক্ততার পেছনেও রয়েছে একই ভাবনা। ফ্যাশনকে কেবল পোশাক হিসেবে না দেখে একটি দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতার বাহক হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটি। সেই ভাবনা থেকেই টুয়েলভের বিভিন্ন ফ্যাশন সংগ্রহে নকশী কাঁথার নকশা ও শিল্পভাবনা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নকশী কাঁথার সঙ্গে যুক্ত কারুশিল্পী ও নকশাশিল্পীদের সৃজনশীলতা ও অবদানকে সম্মান জানানোও ছিল এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। তবে অংশগ্রহণকারীদের কাছে ম্যারাথনটি কেবল প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। দৌড়, শরীরচর্চা ও সক্রিয় জীবনধারার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার সুযোগও তৈরি হয় এ আয়োজনে। বিশেষ করে তরুণদের অংশগ্রহণ নকশী কাঁথার মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে নতুনভাবে জানার ও উপলব্ধি করার ক্ষেত্র তৈরি করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
হাতিরঝিলজুড়ে ম্যারাথনের মূল পর্ব অনুষ্ঠিত হলেও সমাপনী আয়োজন করা হয় হাতিরঝিল অ্যাম্ফিথিয়েটারে। সেখানে নকশী কাঁথাকে কেন্দ্র করে এনএসইউ রানার্সের সদস্যরা পরিবেশন করেন বর্ণাঢ্য ফ্ল্যাশমব। নৃত্য ও সংগীতের সমন্বয়ে তৈরি এ পরিবেশনায় ঐতিহ্যবাহী নকশী কাঁথার ভাবনাকে সমকালীন পরিবেশনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। দৌড়ের পর এমন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে করে তোলে আরও উৎসবমুখর।
সমাপনী অনুষ্ঠানে ছিল আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ। শিল্পী মিশু সাব্বিরের নির্মিত ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির বিশাল আকৃতির একটি মুরাল প্রদর্শন করা হয় সেখানে। শিল্পকর্মটি বর্তমানে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। বিশাল এই মুরাল অনুষ্ঠানস্থলে অংশগ্রহণকারী ও দর্শনার্থীদের মধ্যে তৈরি করে বিশেষ আগ্রহ। একজন দেশীয় শিল্পীর সৃজনশীলতায় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এক ক্রীড়া তারকার প্রতিকৃতি তুলে ধরার উদ্যোগও আয়োজনটিতে যোগ করে আলাদা মাত্রা।
অংশগ্রহণকারীদের মতে, ‘নকশী কাঁথা ম্যারাথন’ শুধু একটি দৌড় প্রতিযোগিতা নয়, বরং বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। খেলাধুলা ও শরীরচর্চার মতো আধুনিক জীবনযাপনের অনুষঙ্গের সঙ্গে দেশের ঐতিহ্যকে যুক্ত করা গেলে তরুণদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে এ ধরনের আয়োজন বাংলাদেশের লোকজ শিল্প ও সৃজনশীলতাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগও তৈরি করতে পারে।
আয়োজনটির মধ্য দিয়ে সুস্থ জীবনধারার প্রতি সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর বার্তাও উঠে এসেছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রায় শরীরচর্চা ও মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব যেমন বাড়ছে, তেমনি বিশ্বায়নের প্রভাবে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনুভূত হচ্ছে। সেই দুই বিষয়কে এক আয়োজনের মাধ্যমে সামনে আনার চেষ্টা ছিল ‘নকশী কাঁথা ম্যারাথন’-এ।
টুয়েলভ জানিয়েছে, দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা এবং সুস্থ জীবনধারাকে উৎসাহিত করে এমন উদ্যোগের সঙ্গে ভবিষ্যতেও সম্পৃক্ত থাকতে চায় তারা। দেশীয় শিল্প ও ফ্যাশনের বৈচিত্র্যকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করার ক্ষেত্রেও কাজ করার প্রত্যয় জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
হাতিরঝিলের ভোরের দৌড় থেকে অ্যাম্ফিথিয়েটারের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সব মিলিয়ে ‘নকশী কাঁথা ম্যারাথন’ হয়ে উঠেছিল ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক ব্যতিক্রমী সম্মিলন। প্রায় দেড় হাজার দৌড়বিদের অংশগ্রহণ, নকশী কাঁথার থিম, বর্ণাঢ্য ফ্ল্যাশমব এবং মেসির বিশাল মুরাল, সবকিছু মিলিয়ে আয়োজনটি একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সীমা ছাড়িয়ে পরিণত হয় বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও তারুণ্যের সম্মিলিত উদযাপনে।










