আগামীর সময়

৯ বছর পরও রোডম্যাপে আটকে ১ বছরের বিসিএস

৯ বছর পরও রোডম্যাপে আটকে ১ বছরের বিসিএস

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়

এক বছরে বিসিএস শেষ করার রোডম্যাপ করেছিলেন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক। সময়টা ছিল ২০১৬। এরপর অনেক জল ঘোলা হয়েছে। ড. সাদিকের পরের চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন। তিনিও ছিলেন একই রোডম্যাপে। বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মোবাশ্বের মোনেমের অবস্থানও তাই। অর্থাৎ টানা ৯ বছর পর এসে পিএসসি এখনও এক বছরের রোডম্যাপে আটকে আছে।

ড. মোবাশ্বেরের এক বছরের রোডম্যাপের কথা উঠে এসেছে পিএসসির ‘বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৫’-এ। যা গত ১ মার্চ রবিবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে হাত বদল করেন পিএসসির চেয়ারম্যানসহ ১৫ সদস্য। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় পিএসসির প্রতিবেদন সংসদে পাস হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এরপর জনতার জন্য উন্মুক্ত হবে ওয়েবসাইটে।

রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম জানান, প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক এবং কমিশন পরিকল্পনা রাষ্ট্রপতি অবহিত হন। এক বছরে একটি বিসিএস শেষ করার রোডম্যাপ বাস্তবায়নের তাগিদ দেন তিনি।  

এই রোডম্যাপ হয়েছিল বেকারদের জীবনের সোনালী সময় রক্ষায়। বিসিএসের নামে পিএসসি তারুণ্যের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। যখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে চাকরিতে ঢোকার কথা, তখন তারা বিসিএসের জন্য বসে থাকে। এতে অপচয় শুধু চাকরিপ্রার্থীদের নয়, হচ্ছে সরকারেরও। ৫১ মাসে অর্থাৎ চার বছর তিন মাসে শেষ হয়েছিল ৪১তম বিসিএস। ৩৮তম বিসিএসে লেগেছিল ৪৮ মাস। দুটোই ছিল সাধারণ বিসিএস।

প্রতিবেশী ভারতে প্রতি বছর একটি ব্যাচের নিয়োগ হয়। বিজ্ঞাপন প্রকাশ থেকে যোগদানও হয়ে যায়। এরপর শুরু দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ। আর বাংলাদেশের বাস্তবতা উল্টো। অনেক সময় নেওয়া হয় প্রার্থী বাছাইয়ে। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার তীব্র প্রতিযোগিতার ধকল সয়ে দীর্ঘ সময় পর তারা যখন চাকরি পান তখন আর প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় থাকে না। প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাদের পোস্টিং দেওয়া হয়। চাকরির শুরুতেই তারা একটা জটিল পরিস্থিতিতে পড়েন।

এই অবস্থা থেকে বের হতে ২০১৬ সালে ড. মোহাম্মদ সাদিক বিজ্ঞাপন প্রকাশ থেকে শুরু করে নিয়োগ এক বছরে শেষ করার রোডম্যাপ করেন। যা পরে ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করেন পরবর্তী চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন। দুইজনই সরকারের সাবেক প্রভাবশালী সচিব। তারপরেও এ রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

এর সবচেয়ে বড় কারণ- বিসিএসের বাইরেও পিএসসিকে করতে হয় অনেক কিছু। ক্যাডার, নন-ক্যাডার, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ পিএসসি। রয়েছে এসব চাকরির পদোন্নতির বিষয়ও। কখনও এসব চাকরিতে শাস্তির বিষয় আসলে তাতেও মত লাগে পিএসসির। বিসিএসটা দৃশ্যমান অর্থাৎ দেখা যায়। অনেক কাজ থাকে আড়ালে, যা সংখ্যায় অনেক। তাছাড়া খাতা দেখায় এবং ভাইভাতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। ভাইভাতে একজনের মেধা যাচাইয়ে লাগে পর্যাপ্ত সময়। ইচ্ছা করলেই সেই সময় কমানো যায় না।

তারপরেও এক বছরে একটি বিসিএস শেষ করার প্রত্যয় ছিল সাবেক দুই চেয়ারম্যানেরই। তারা সমর্থন পেয়েছিলেন সেই সময়কার সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানেরও। তবে পাবলিক পরীক্ষা, বিভিন্ন স্তরের ভোট আয়োজন করতে প্রশাসন ব্যস্ত থাকে বছরভর। নিজেদের কাজ অনেকটা গুছিয়ে আনতে পারলেও পিএসসি প্রশাসনের সহায়তা পায়নি। এক বছরে বিসিএস শেষ না করতে পারার এটা সবচেয়ে বড় কারণ।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের কমিশন প্রশাসন সংস্কারের যে সুপারিশ করেছে, সেখানেও আছে বিসিএসের সময় কমিয়ে আনার প্রস্তাব। একাধিক পিএসসি করারও সুপারিশ রয়েছে।

প্রতি বছর একটি বিসিএসের চূড়ান্ত সুপারিশ সম্ভব মনে করেন পিএসসির সচিব ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া।

‘এক বছর এক বিসিএস কার্যক্রম’ আগে থেকে শুরু হলেও এর দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়া শুরু হয়েছে গত বছর থেকে।

২০২৫ সালের কমিশন প্রতিবেদনে রয়েছে, প্রিলিমিনারি থেকে চূড়ান্ত ফল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপচয় রোধে এক বছরে একটি বিসিএসের রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে এক বছরের মধ্যেই চূড়ান্ত সুপারিশ করা সম্ভব প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে।

কমিশন প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, গতানুগতিক ধারা বদলে এখন প্রশ্নপত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত মডারেটররা সশরীরে কমিশনে উপস্থিত হয়ে প্রশ্নপত্র তৈরি করছেন। এছাড়া প্রশ্নপত্র ছাপা হয় কমিশনের নিজস্ব প্রেসে। এতে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি সাশ্রয় হচ্ছে সময় ও অর্থ। পরীক্ষক ও নিরীক্ষকরা কমিশনে গিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করছেন। এই পদ্ধতির প্রয়োগে ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিতে মাত্র ৩৩ কর্মদিবসে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি উত্তরপত্র মূল্যায়ন শেষে ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। সামনে বিসিএসগুলোতে এই পদ্ধতি ব্যবহারে দ্রুত সময়ে ফলাফল প্রকাশ সম্ভব হবে।

এছাড়াও চাকরিপ্রার্থীদের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়েছে কমিশন। গত দেড় বছরে বেশ কিছু নীতিগত পরিবর্তনের সুফল পাচ্ছে চাকরিপ্রার্থীরা। এর মধ্যে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের আবেদনের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩২, আবেদন ফি ৭০০ থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা এবং অনগ্রসর প্রার্থীদের ফি ১০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ টাকা করা হয়েছে। দুর্নীতি কমাতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হয়েছে। প্রার্থীকে বারবার একই ক্যাডারে সুপারিশ না করায় বেশি প্রার্থী সুযোগ পাচ্ছেন।

সরকারি কর্ম কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার অভাব রয়েছে বলে মনে করছে কমিশন। যথা সময়ে অর্থের সংকুলান করতে না পারায় দ্রুত ফলাফল প্রকাশসহ কমিশনের নানা ইতিবাচক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে পড়তে হয় চ্যালেঞ্জে।

ব্যয় সংক্রান্ত বিধান থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সাংবিধানিক পদমর্যাদা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলেও উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে।

    শেয়ার করুন: