পশ্চিমবঙ্গ
৯১ লাখ মানুষকে ভোটাধিকারহীন রেখেই নির্বাচন কাল

নির্বাচন ঘিরে সেজে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গ
নির্বাচন ঘিরে সাজ সাজ রব পশ্চিমবঙ্গে। প্রথম দফা ভোটের আগে শেষ দিন আজ। তবে এখন পর্যন্ত ভোটার তালিকার বাইরে রাজ্যটির প্রায় ৯১ লাখ মানুষ, যা রাজ্যের মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।
এত বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটের অধিকার হারানোয় ভারত জুড়ে উঠেছে সমালোচনার ঝড়। ৯১ লাখ মানুষের মধ্যে ৬০ লাখকে চিহ্নিত করা হয়েছে মৃত হিসেবে। আর বাকি প্রায় ৩০ লাখকে নিয়েই মূলত প্রধান বিতর্ক। ভোটার তালিকা সংশোধনকে সমালোচকরা বর্ণনা করছেন ‘রক্তহীন রাজনৈতিক গণহত্যা’ এবং সংখ্যালঘুদের ব্যাপকভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্যোগ হিসেবে। বাদ পড়া ভোটাররা আপত্তি জানিয়ে আদালত পর্যন্ত গেলেও, শেষ পর্যন্ত তাদের থাকতে হচ্ছে ভোটাধিকারহীন।
‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) নামে পরিচিত এই প্রক্রিয়াটি চালানো হচ্ছে ভারত জুড়ে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। নরেন্দ্র মোদির সরকার এটিকে ব্যাখ্যা করেছে ‘অনুপ্রবেশকারী’ রোধের উদ্যোগ হিসেবে।
কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের এই ভোটার তালিকা ‘পরিশুদ্ধ’ করার উদ্যোগ জন্ম দিয়েছে তীব্র ক্ষোভের। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে বিরল দ্রুততায় তৈরি করা হয়েছে নতুন ভোটার তালিকা।
প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে রাজ্যটিতে। ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যে আধিপত্য বিস্তার করলেও বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এখনো তৈরি করতে পারেনি শক্ত অবস্থান। রাজ্যের বড় মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনাস্থা রয়েছে তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মুসলমান বাস করেন, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নাম বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, মুসলমানরা এ প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, বিশেষ করে যেসব জেলায় তাদের জনসংখ্যা বেশি। যেমন মুর্শিদাবাদে ৪ লাখ ৬০ হাজার, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩ লাখ ৩০ হাজার এবং মালদায় বাদ গেছে ২ লাখ ৪০ হাজার নাম।
গোবিন্দপুর, গোবরা ও বালকি গ্রামের বহু মুসলিম পরিবার জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় নথি থাকলেও কেটে দেওয়া হয়েছে তাদের নাম। আবার অনেকেই বাসস্থানের প্রমাণ, বিয়ের পর নাম পরিবর্তন, বানান ভুল বা অন্য রাজ্যে স্থানান্তরের প্রমাণ দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ দ্য গার্ডিয়ানকে বলছেন, ‘বঙ্গে যা হয়েছে, তা সাংবিধানিক অপরাধ। এটি ভারতের জনগণ ও বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ।’
তার মতে, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের ইতিহাসে এটি একটি কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হবে। একজন মানুষ, একটি ভোট— এটি সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার। আপনি যতই দরিদ্র বা অসহায় হোন, আপনার রয়েছে ভোটাধিকার। কিন্তু ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে সেটি।’
বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন সংস্থার মতে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি হারে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, যা জোরদার করেছে উদ্দেশ্যমূলক টার্গেটিংয়ের অভিযোগ।
গবেষণা সংস্থা সাবার ইনস্টিটিউটের প্রধান সাবির আহমেদ বললেন, ‘আমাদের গবেষণা অনুযায়ী, ধর্মই সবচেয়ে বড় পার্থক্যকারী বিষয়। যে পরিমাণ মুসলিম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
সমালোচকরা এসআইআর প্রক্রিয়াকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তারা একে আখ্যা দিয়েছেন বিজেপির পক্ষে নির্বাচনী ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হিসেবে। তাদের মতে, এই প্রক্রিয়া তদারকির দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশন আর নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
এই প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ভারতের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশিও। তার ভাষ্য, ‘এসআইআর সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়, এটি হয়রানির জন্য তৈরি। প্রশাসনিকভাবে এটি একটি বিপর্যয় এবং উদ্দেশ্যও সৎ নয়।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘৯৯ শতাংশ নির্ভুলতা পেতে আমাদের ৩০ বছর লেগেছিল। তারা তিন মাসে তার চেয়েও বেশি অর্জন করতে চায়— এত তাড়াহুড়ার কারণ কী?’
প্রশ্ন উঠেছে নতুন এআই-সহায়ক অ্যালগরিদম ব্যবহার নিয়েও। এটি তথাকথিত ‘যুক্তিগত অসংগতি’ চিহ্নিত করতে গিয়ে লাখো মানুষের নাগরিকত্ব প্রমাণের প্রয়োজন তৈরি করেছে, এমনকি এর মধ্যে ছিলেন নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অ্যালগরিদম সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেয়নি—যেমন বাংলা নামের বানান ভিন্নতা বা পারিবারিক নথিতে সামান্য অসামঞ্জস্য। এমনকি অল্পবয়সী অভিভাবক বা বেশিসংখ্যক ভাইবোনকেও চিহ্নিত করা হয়েছে ‘অসংগতি’ হিসেবে।
অর্থনীতিবিদ পারাকালা প্রভাকর সতর্ক করেন, ‘এটি সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্বকেই ধ্বংস করার মতো— একটি রক্তহীন রাজনৈতিক গণহত্যা।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, আলজাজিরা

