৫৪ ডিগ্রি তাপমাত্রায় যেভাবে কাটে মানুষের জীবন

সংগৃহীত ছবি
ঘর থেকে বের হলেই মনে হচ্ছে আগুনের দেয়ালের ভেতর ঢুকে পড়েছি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক দিন ধরেই তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি লাগছে। পাখা চলছে, তবু স্বস্তি নেই।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, গত কয়েক দিন ধরে ইউরোপও ভয়াবহ তাপপ্রবাহে পুড়ছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি বা তারও ওপরে উঠেছে। দাবদাহে শিশুসহ বেশ কিছু মানুষের মৃত্যুও হয়েছে। কোথাও স্কুল বন্ধ, কোথাও জারি হয়েছে স্বাস্থ্য সতর্কতা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন তাপপ্রবাহ এখন আর বিরল ঘটনা নয়।
আমরা ৩৬-৩৮ ডিগ্রিতেই হাঁসফাঁস করছি। তাহলে এমন একটি জায়গার মানুষের কথা ভাবুন, যেখানে গ্রীষ্মে দিনের পর দিন ৫০ ডিগ্রিরও বেশি তাপমাত্রায় জীবন চলে। তারা অফিসে যায়, বাজার করে, সন্তানকে বড় করে, এমনকি ব্যায়ামও করে। পৃথিবীর অন্যতম উষ্ণ স্থান যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালিতে ঠিক এভাবেই বেঁচে আছেন কয়েক শ মানুষ।
ওভেনের ভেতর হাঁটার মতো অনুভূতি
ডেথ ভ্যালির ফার্নেস ক্রিক অঞ্চলে আগস্ট মাসে দিনের গড় তাপমাত্রা প্রায় ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অনেক দিনই তা ৫২ থেকে ৫৪ ডিগ্রিতে পৌঁছে যায়। বাইরে বের হলে মনে হবে যেন জ্বলন্ত ওভেনের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন।
ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের তথ্য কর্মকর্তা ব্র্যান্ডি স্টুয়ার্ট বলেন, বাইরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই ত্বক বুঝিয়ে দেয় জায়গাটি কতটা গরম। আশ্চর্যের বিষয়, ঘামও ঠিকমতো টের পাওয়া যায় না। কারণ, শরীর থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা শুকিয়ে যায়।
এই উপত্যকায় সারা বছর বাস করেন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষ। তাঁদের বেশির ভাগই জাতীয় উদ্যানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় হোটেলের কর্মী কিংবা তাঁদের পরিবারের সদস্য।
কীভাবে মানিয়ে নেন?
এত গরমে প্রথম কয়েক মাস প্রায় সবারই কষ্ট হয়। শিক্ষা বিভাগের প্রধান প্যাট্রিক টেইলর জানিয়েছেন, তার প্রায় এক বছর লেগেছিল পরিবেশের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে। শুরুতে প্রচণ্ড ক্লান্তি, অতিরিক্ত ঘাম, পানিশূন্যতা ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি ছিল নিয়মিত।
তবে মানুষের শরীর ধীরে ধীরে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় তাপ-অভিযোজন। কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে একই পরিবেশে থাকলে শরীর ঘাম ঝরানোর পদ্ধতি, রক্ত সঞ্চালন এবং তাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কিছুটা বদলে নেয়। তাই দীর্ঘদিনের বাসিন্দারা নতুনদের তুলনায় অনেক ভালোভাবে গরম সহ্য করতে পারেন।
আরেকটি সুবিধা হলো, ডেথ ভ্যালির গরম শুষ্ক। বাতাসে আর্দ্রতা খুব কম। ফলে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে গিয়ে শরীরকে কিছুটা ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের মতো আর্দ্র আবহাওয়ায় সেই সুযোগ থাকে না। এখানকার গরম তাই তুলনামূলক কম তাপমাত্রাতেও বেশি কষ্টদায়ক লাগে।
জীবন থেমে থাকে না
প্রচণ্ড গরম হলেও জীবন থেমে নেই। কেউ অফিসে যান, কেউ পর্যটকদের সেবা দেন, কেউ আবার জাতীয় উদ্যানে কাজ করেন। সন্ধ্যা নামলে শিশুরা খেলার মাঠে যায়। অনেকে হাঁটাহাঁটি করেন, আবার কেউ শরীরচর্চাও করেন।
অবাক করা বিষয়, এখানকার কিছু বাসিন্দা জুলাই মাসেও দৌড়ান। তবে এটি মোটেও পর্যটকদের জন্য নয়। বছরের পর বছর সেখানে বসবাস করার কারণেই তাঁদের শরীর কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
বাইরে বের হওয়ার আগে নিয়ম
ডেথ ভ্যালির বাসিন্দাদের কাছে পানির বোতল মানে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম। কেউ বাইরে বের হন না পর্যাপ্ত পানি ছাড়া।
অনেকে সঙ্গে রাখেন স্যাটেলাইট ফোন। কারণ, দুর্গম এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ নাও করতে পারে। গাড়ির চাকা নষ্ট হলে বা যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তাই গাড়ির অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা তাঁদের অভ্যাস।
এখানে ভ্রমণে আসা মানুষদেরও বলা হয়, পর্যাপ্ত পানি, খাবার এবং জরুরি সরঞ্জাম ছাড়া কখনো মরুভূমির পথে বের না হতে।
ঘরও আলাদা
ডেথ ভ্যালির বেশির ভাগ বাড়িতে দুটি শীতলীকরণ ব্যবস্থা থাকে। একটি সাধারণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। অন্যটি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে বাতাস ঠান্ডা করা বিশেষ কুলার। শুষ্ক আবহাওয়ায় এই কুলার খুব কার্যকর।
তবে সবাই সব সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করেন না। কেউ কেউ বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাতে সীমিত ব্যবহার করেন। কারণ, সেখানে বিদ্যুৎ ব্যয়ও কম নয়।
রাতই যেন দিনের স্বস্তি
দিনের তুলনায় রাত অনেকটাই সহনীয়। গ্রীষ্মেও রাতের তাপমাত্রা প্রায় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। তাই অনেকে সন্ধ্যার পর হাঁটেন, খেলাধুলা করেন কিংবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে সময় কাটান।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
ডেথ ভ্যালিও এখন আগের চেয়ে আরও গরম হচ্ছে। সাম্প্রতিক দুই দশকে এখানকার সবচেয়ে উষ্ণ মাসগুলোর বেশ কয়েকটি রেকর্ড হয়েছে। শুধু দিনের তাপমাত্রাই নয়, রাতের তাপমাত্রাও বেড়েছে। ফলে শরীর বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন চরম তাপপ্রবাহ ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে।
পৃথিবীর সবচেয়ে গরম জায়গা?
ডেথ ভ্যালির ফার্নেস ক্রিকে ১৯১৩ সালে ৫৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। এটি এখনো বিশ্বের সর্বোচ্চ বায়ুর তাপমাত্রার সরকারি রেকর্ড হিসেবে পরিচিত। তবে কিছু আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সেই সময়ের পরিমাপ পদ্ধতিতে ত্রুটি থাকতে পারে।
রেকর্ড নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে কারও দ্বিমত নেই—পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ স্থানগুলোর মধ্যে ডেথ ভ্যালি অন্যতম। ২০২০ সালেও সেখানে ৫৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নির্ভরযোগ্যভাবে রেকর্ড করা হয়েছিল।
পাঠক ভাবুন তো, আমরা যখন ৩৬-৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় হাঁসফাঁস করি, তখন পৃথিবীর কোথাও মানুষ বছরের পর বছর ৫০ ডিগ্রিরও বেশি গরমে সংসার চালাচ্ছেন, সন্তান বড় করছেন, চাকরি করছেন, জীবন কাটাচ্ছেন। কাজেই এই লেখাটি পড়ার পর এই গরমে একটু স্বস্তি অনুভব করতেই পারেন, কি বলেন?
সূত্র: বিবিসি, বিজনেস ইনসাইডার, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া), ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক






