দ্রোকপাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ

যাযাবর দ্রোকপাদের সঙ্গে লেখক এভারেস্টজয়ী ইকরামুল হাসান শাকিল
হিমালয়ের সাড়ে চার হাজার মিটার উঁচুতে যখন বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, তখন বাতাসটা একেবারে ধারালো ছুরির মতো গায়ে এসে বিঁধে। নেপাল-তিব্বত সীমান্ত ঘেঁষে ‘দ্য গ্রেট হিমালয়ান ট্রেইল’-এর এই দীর্ঘ অভিযানে আমার প্রতিটি পেশি তখন একটু আশ্রয়ের জন্য হাঁসফাঁস করছে। সূর্যও পশ্চিম আকাশে মেঘ ছুঁয়ে থাকা পর্বতের আড়ালে ডুবে যাচ্ছে। অন্ধকার নামার আগেই নিরাপদ স্থানে তাঁবু ফেলতে হবে। বিশাল নির্জনতার মধ্যে হঠাৎ দূরে নজরে এলো পশুর পশমে বোনা দুটি কালচে খয়েরি রঙের তাঁবু। হিমালয়ের বিস্ময়কর যাযাবর দ্রোকপাদের তাঁবু।
কাছে গিয়ে দেখি, মাঝবয়সী এক নারী ও তার কিশোরী মেয়ে শুকনা গোবর সংগ্রহ করছে। আমাকে আসতে দেখে তারাও অবাক হয়েছে। দূর থেকেই কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে। পরিচয় দিলাম, যদিও হয়তো আমার কথার অর্ধেকই বুঝতে পারেনি। আমিও যে বুঝেছি, তেমন না। তারা তিব্বতি স্থানীয় ভাষায় কথা বলেন। নেপালি ভাষাও কম বোঝেন। আমি নেপালি ও ভাঙা ভাঙা দুই-একটা তিব্বতি শব্দ বলে কথা চালিয়ে নিলাম। তাদের সঙ্গে তাঁবুর ভেতরে ঢুকলাম। আমাকে এক মগ স্যুচিয়া দেওয়া হলো। স্যুচিয়া তিব্বতি একধরনের বিশেষ চা। বাটার, লবণ, চা পাতা আর পানি দিয়ে বিশেষ কায়দায় বানানো। এর মধ্যেই শত শত লোমশ ছাগল আর ভেড়ার পাল নিয়ে ফিরে এলো পাঁচজন মানুষ। চারজন পুরুষ আর একজন নারী। তারা এই ছাগল-ভেড়াকে খাওয়াতে পাহাড়ের ওপরে চারণভূমিতে নিয়ে গিয়েছিল।
এই দ্রোকপাদের সঙ্গেই খাওয়ার ও থাকার ব্যবস্থা হলো। এখন সবাই তাঁবুর ভেতরে গোল করে বসে ছ্যাঙ নামক এক বিশেষ পানীয় পান করছে আর অট্টহাসিতে গল্পে ব্যস্ত। আমি আর সেই কিশোরী মেয়েটি অবশ্য স্যুচিয়া নিয়েই বসে আছি আর মনোযোগ দিয়ে তাদের গল্প শুনছি।
রাতে থালায় এলো সাধারণ ভাত, ডাল আর সঙ্গে ওদের স্পেশাল মাশরুম দিয়ে খাসির অণ্ডকোষ ভুনা!
খাওয়া শেষে তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়াতেই মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়! অমাবস্যার কালো আকাশে তারাদের মেলা বসেছে, চারপাশের হিমালয় যেন এক অদ্ভুত মায়াবী রূপ নিয়েছে। আজকের রাতে আকাশে চাঁদের কোনো চিহ্ন নেই, চারপাশ একেবারে নিকষ কালো। কিন্তু মাথার ওপরের আকাশটা কোটি কোটি তারায় জ্বলজ্বল করছে! এমন হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার রাতে তাদেরই সঙ্গে গাদাগাদি করে তাঁবুতে ঠাঁই হলো আমার।
‘দ্রোকপা’ বা ‘ড্রোকপা’ শব্দটার সহজ মানে হলো ‘যাযাবর’ বা ‘উঁচু চারণভূমির মানুষ’। বলা হয়ে থাকে, শত শত বছর আগে তিব্বতের মহাকাব্যিক যোদ্ধা রাজা ‘গেসার’ যখন হিমালয়ের এই দুর্গম উপত্যকাগুলোতে যুদ্ধ করতে এসেছিলেন, তখন তার সেনাদলের একটা অংশ এই বিশাল পর্বতের প্রেমে পড়ে যায়। রাজকীয় জীবন ছেড়ে তারা রয়ে যায় এই উঁচু চারণভূমিগুলোতেই।
ইতিহাস বলে, শত শত বছর ধরে সিল্ক রোড ও তিব্বত-নেপাল বাণিজ্য পথের প্রধান সংগ্রাহক আর রক্ষক ছিল এই দ্রোকপারা। এরা লবণের ব্যবসা করত। হিমালয়ের ওপারে তিব্বতের নোনা হ্রদ থেকে লবণ নিয়ে এসে নেপালের নিচু উপত্যকার চালের সঙ্গে তা বিনিময় করত। আজও কোনো মানচিত্র বা সীমানা ছাড়াই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই রুটে চামরী গাইয়ের পাল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা।
রাত যত বাড়ছে, তাপমাত্রা ততই কমছে। কিন্তু ওদের হাতে বোনা তাঁবু ‘রেবা’ ইয়াক বা চামরী গাইয়ের পশমে তৈরি। এটি ভেদ করে ঠান্ডা ভেতরে ঢোকার সাধ্য নেই! এই উচ্চতায় গভীর ঘুম হয় না। বিশেষ করে আমরা যারা পর্যাপ্ত অক্সিজেনে ঘুমিয়ে অভ্যস্ত। তবে এরা গভীর ঘুমের সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে। আমার ঘুম একটু পরপরই ভেঙে যাচ্ছে। ঘুম ভাঙার আরও একটি কারণ আছে। সেটা হলো নাক ডাকার শব্দ। মনে হচ্ছে, এক অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নাক ডাকার প্রতিযোগিতা করছে।
দিনের আলোর আগেই তাদের ঘুম ভাঙে এবং দিনের শুরু হয়। তাদের কথার শব্দে আমারও ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে দেখি, চুলায় আলু সিদ্ধ হচ্ছে। সবার হাতেই স্যুচিয়ার মগ। উঠে বসতেই আমার দিকেও এগিয়ে দিল এক মগ। ওটা হাতে নিয়েই তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলাম। চারপাশে ছাগল আর ভেড়ার পাল ছড়িয়ে আছে। ওপরে শিশির জমে বিন্দু বিন্দু বরফ হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে, ঘাসের ওপরে একটা হালকা সাদা চাদর বিছিয়ে রাখা হয়েছে।
সকালের নাশতা হলো স্যুচিয়া আর সিদ্ধ আলু দিয়ে। তারপর সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমার পথে পা বাড়ালাম। গ্রেট হিমালয়ান ট্রেইলের এই রাতের অভিজ্ঞতা এখনো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে।






