দুই চাকায় মালয়েশিয়া-১
পাদাং বেসার টু জিত্রা-৬০ কিলোমিটার

মালয়েশিযার পাদাং বেসার থেকে জিত্রার পথে বাবর আলী
৩ পি (পপুলেশন, পল্যুশন, পভার্টি) এর দেশ থেকে পা রাখলাম আরেক ৩ পি (পেট্রোলিয়াম, পাম, পেট্রোনাস) এর দেশে! এবারের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়া একদম ধর্তব্যের মধ্যেই ছিল না। গত ফেব্রুয়ারিতেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশে আসা হয়েছিল। ওয়েস্ট কোস্ট ধরে মালাক্কা, ইপো, জর্জটাউন, লাংকাউই আর কুয়ালালামপুর ঘোরা হয়েছিল। এ বছরেই যে ফের আসা হলো, এর পেছনে আমাদের পছন্দের অন্য দুটি দেশের টিকেটের মাত্রাতিরিক্ত দাম আর ভিসা পেতে বিলম্ব হওয়াই দায়ি।
এবার খুব করে চেয়েছিলাম একটা সাইক্লিং বা লম্বা হাঁটার অ্যাডভেঞ্চারে বেরোতে। গতবার পেনাং এর জর্জটাউনে পরিচিত হওয়া ইকুয়েডরের পলা নামে এক মেয়ের কাছে শোনা এক সাইক্লিং ট্রেইলের গল্পই জুমন ভাই আর আমাকে টেনেছিল। গল্প বলার সময় পলার রসগোল্লার মতো চোখ সুন্দর হাসিটার চেয়েও বেশি টেনেছিল। ওর সঙ্গে কথা শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই গুগলে খানিকটা ঘাটাঘাটি করে আমরা ঠিক করেছিলাম, এ বছরেই ওই সাইক্লিং ট্রিপটা করব। নানান জটিলতায় সেটা আর হলো না।
একেবারে শেষ মুহুর্তে মালয়েশিয়া আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবার। তবে ভিসা পাওয়ার আগেই টিকেট কেটে ফেলেছিলাম। ইউএস-বাংলার অফিশিয়ালদের সৌজন্যে সাইকেল নিয়ে ঝামেলাই পোহাতে হয়নি ঢাকা এয়ারপোর্টে। আমাদের গন্তব্য মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন নিয়ে নানান গল্প শুনি নানাজনের মুখে। আমার দুবার আসার অভিজ্ঞতাই বেশ আরামপ্রদ। মালয়েশিয়ান সাইডে কোনবারই ২-৩ মিনিটের বেশি লাগেনি। পাসপোর্ট, রিটার্ন টিকেট আর MDAC কার্ডের পিডিএফ দিয়ে আরামসে সারা গেল ইমিগ্রেশন। স্থানীয় ভাষায় অভিবাদন জানিয়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে কথাবার্তা শুরু করলে বেশ সুবিধা পাওয়া যায় এক্ষেত্রে।
আমার ঠিক পাশে লাইনে দাঁড়ানো বাঙালি ভদ্রলোককে ইমিগ্রেশন অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, 'What is the purpose of your visit?' উনি জবাব দিলেন, 'সেভেন টাইমস!' ইমিগ্রেশন অফিসার এরপরেই ওনাকে লাইন থেকে সরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে গেলেন। মামলা সামলাও এবার! সেভেন টাইমস না বলে 'সেভেন-ইলেভেন' (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অঞ্চলে জনপ্রিয় চেইন শপ) বললেও কিছুটা সুবিধা পাওয়া যেত! কুয়ালামপুর এয়ারপোর্টে আমাদের সাইকেলের বক্স আমাদের আগেই 'Oversize Luggage' কাউন্টারে অপেক্ষা করছিল।
ওখান থেকে বেরিয়ে বিকেল নাগাদ TBS (মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অবস্থিত দেশটির অন্যতম বড়, আধুনিক এবং ব্যস্ততম আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল) এর উদ্দেশ্য বাসে উঠলাম। কুয়ালালামপুরের এক্সপ্রেসওয়েতেও তীব্র জ্যাম। রাতে TBS থেকেই আমরা পাদাং বেসার বাসে উঠব। ছোটো বোন স্বর্ণা বেশ আগেই টিকেট করে রেখেছিল। সুবাং জায়াতে থাকা সুপ্ত’র বাসায় দেশ থেকে নিয়ে আসা সাইকেলের বাক্সগুলো রেখে আসার কথা থাকলেও জ্যামে অনেকটুকু সময় নষ্ট হওয়াতে ওকেই বললাম TBS চলে আসতে। জুমন ভাই আর আমি বাস থেকে নেমে সাইকেল আনবক্সিং করে চাকা-পার্টসগুলো লাগাতে শুরু করলাম। এর মধ্যেই ঘটল বিপত্তি। প্রেসারাইজড কেবিনে যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেজন্য এরোপ্লেনে উঠার সময় সাইকেলের টিউবের হাওয়া বের করে দিয়েছিলাম। এখন হাওয়া দিতে গিয়েই আমার চার বছরের পুরোনো Presta টিউবের একপ্রান্ত লিক করল। বাস কাউন্টারের এক দোকান থেকে এন্টি-কাটার এনে ওই অংশটুকু ফেলে দিলাম। ফের চেষ্টা করতেই পাম্পারের টিউবের মাঝ বরাবর গেল ফেটে! কপাল আর কাকে বলে! প্রণয়মের 'কপালভাতি' নামে একটা এক্সারসাইজ আমি নিয়মিতই করি; আর এরকম সাইক্লিং ট্রিপে এলে সেই এক্সারসাইজই মাঝে মাঝে রূপ নেয় 'পোড়াকপাল-ভাতি'-তে। পাম্পারের ব্যবস্থা কাল করা যাবে ভেবে বাকি কাজে মনোযোগ দিলাম।
সুপ্তকে সাইকেলের বাক্সগুলো বুঝিয়ে দিয়ে ও বোল্ট (রাইড শেয়ারিং অ্যাপ) যোগে ওর গন্তব্যের দিকে রওনা হতেই আমরা নির্দিষ্ট গেটের দিকে এগোলাম। মালয়েশিয়ার বাস স্টেশনগুলো রীতিমতো এয়ারপোর্ট স্টাইলে পরিচালিত হয়। এমনকি বাসে উঠার আগে নিতে হয় বোর্ডিং পাসও। আর সবকিছুই অটোমেটেড। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলা বাস ড্রাইভারের সঙ্গে আরেক দফা দেনদরবার করে সাইকেল উঠিয়ে বাসের সিটে উঠলাম প্রচুর খিদে নিয়ে৷ নানান ঝক্কিতে খাবারের কথাই ভুলে গেছি। সকালে ফ্লাইটে দেওয়া খাবার সেই কবে পেট থেকে উধাও হয়ে গেছে। সুপ্ত এর নিয়ে আসা অ্যাপল পাই আর মিষ্টি হ্যাপা থেকে বাঁচাল।
সকাল সাড়ে ছয়টা নাগাদ বাস নামিয়ে দিলো পাদাং বেসারে। বাস স্ট্যান্ড থেকে শখানেক মিটার দূরে থাইল্যান্ড সীমান্ত। একটু হেঁটে চলে গেলাম মসজিদে। এখানে ফ্রেশ হয়ে রাস্তার ধারেই অপেক্ষা করতে লাগলাম। পাম্পার না হলে যাত্রা শুরু করতে পারছি না। জুমন ভাইয়ের পাম্পারে Presta টিউবের পাম্প হয় না। Mr. DIY খুলবে নয়টা নাগাদ। এর মধ্যে পুরো এলাকা ঘুরে কোথাও একটা খাবারের দোকান খোলা পাওয়া গেল না। শুধু জায়গায় জায়গায় প্রচুর লাল টেলিফোন বুথ। ইতোমধ্যে পেটে ছুঁচো রীতিমতো বুকডন দিতে শুরু করেছে। শুধু খাবার নয়, অন্য কোন দোকানও খোলেনি। অথচ পাদাং বেসার মালয়েশিয়াতে বিখ্যাত শপিং এর জন্য!
DIY থেকে পাম্পার নিয়ে সাইকেল রেডি করতে করতে একটা খাবারের দোকান খোলা পাওয়া গেল। থাইল্যান্ড বর্ডার সংলগ্ন বলে ভেবেছিলাম থাই খাবার খাব। মিলল স্যান্ডউইচ, ব্ল্যাক কফি আর মালয়েশিয়ান ডেলিকেসি কুই কসয়ি। তা-ই সই।
ভ্রমকাহিনী বাদ দিয়ে এবার ভ্রমণকাহিনীতে ফেরা যাক। নানান ঝক্কি সামলে সকাল ১০টা পাঁচ নাগাদ উঠে বসলাম সাইকেলের স্যাডলে। 'পাদাং বেসার ০ কি. মি.' লেখা সাইনবোর্ডের সামনে ছবি তুলে যাত্রা শুরু। উল্টোদিকে ঘুরতেই দেখি ট্রাফিক পুলিশের একটা দল গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র দেখছে। গাড়ির মতো হর্সপাওয়ারে না চলে আমাদের সাইকেল চলে হিউম্যান পাওয়ারে। তাই উৎকোচ-নির্মোহ পুলিশ আমাদের ঘাটাল না।
রাস্তায় প্রচুর সাইনবোর্ড চোখে পড়ছে। পারলিস নামক এই প্রদেশের রাজপরিবাররের সদস্যদের মুখই উঁকি দিচ্ছে সাইনবোর্ডে। এটি মালয়েশিয়ার একমাত্র প্রদেশ, যেখানে শাসনকর্তা এখনো 'রাজা' উপাধি ব্যবহার করেন। মালয়েশিয়ার অন্যান্য প্রদেশের শাসনকর্তারা উপাধি হিসেবে 'সুলতান' ব্যবহার করেন। মজার ব্যাপার হলো, রাজা আর রাজপুত্রের শরীরে আনুষঙ্গিক অলংকার আর গয়নার সম্ভার রানি আর রাজকন্যার চেয়ে বেশি! কিছুটা এগোতেই অল্প চড়াই শুরু হলো। এক স্থানে রাস্তার ধারে বেষ্টনী দেওয়া জায়গায় চরতে থাকা মহিষের দেখা গেল। সাইজে বেশ হ্রষ্টপুষ্ট। মহিষের সঙ্গে বক আর ভাত-শালিকের দলের সহাবস্থান দূর থেকেও আঁচ করা গেল।
পথের দুপাশে বিশাল সব খেত। এদিকে মূলত কেনাফ নামে এক ধরনের শস্যখেতই বেশি। এই কেনাফ থেকে যে আঁশ আহরণ হয়, সেটি দিয়ে তৈরি হয় দড়ি, কাগজ কিংবা বায়োপ্লাস্টিকের মতো জিনিস। এতে আমাদের পাটের মতো আঁশ থাকে, অনেক জায়গায় 'জাভা জুট' নামেও এটি পরিচিত। তবে আমাদের দেশি অন্য একটা ফসলের সঙ্গে এর মিল আছে। কেনাফের ফুল অনেকটাই ঢেঁড়সের ফুলের মতো দেখতে।
পথে দুই-একটা ছোটো ক্যাম্পুং বা গ্রাম পড়ল। আকারে অতি নগণ্য। এছাড়া সবখানে দিগন্তবিস্তৃত খেত। একটা বড়ো ট্যাংকের বিপরীতে বিশাল এলাকাজুড়ে কেনাফের চাষ। স্থানীয়রা গাড়ি চালিয়ে খেতের মধ্যে ঢুকে নানান অঙ্গভঙ্গিতে ছবি তুলছে। 'আই লাভ কেনাফ' লেখা সাইনবোর্ডও আছে একটা। উপরে শোভা পাচ্ছে মালয়েশিয়া আর পারলিস প্রদেশের পতাকা। কিছুটা এগোতেই দিগন্তে মাথা তুলল বুকিত চাবাং। চুনাপাথরের তৈরি দুটি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা অনিন্দ্যসুন্দর পাহাড়। চোখ সরানোই মুশকিল এই পাহাড় থেকে। আমি খানিক এগোই আর ফের পেছনে তাকিয়ে দেখি। জুমন ভাই ততক্ষণে খানিক এগিয়ে গেছে।
বুকিত চাবাং ছাড়াও এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটা অদ্ভুতুড়ে দেখতে পাহাড়ও আছে। কোনোটা গম্বুজের মতো, কোনোটা গগনভেদী হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে এক পায়ে খাড়া উঠে গেছে আকাশপানে। পাহাড় আর নানান আকৃতির এগ্রো ফার্ম ছাড়া রাস্তায় কোনো জনপদ নেই। মাঝেমধ্যে দুই-চারটা গাড়ি উল্টোদিক থেকে অতিক্রম করে যাচ্ছে। আরো কিছুদূর এগোতেই খেতের স্থলাভিষিক্ত হলো রাবার আর পাম বাগান। আমরা চলছি চুপিং নামক এলাকার উপর দিয়ে। একটা চৌরাস্তার মোড়ে পড়ল 'তিকিক তারপানাস' নামে উঁচু একটা স্থাপনা। একদম উপরে লেখা ৪০.১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। তিকিক তারপানাস এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো হটেস্ট পয়েন্ট। এই স্থানেই মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা (৪০.১ ডিগ্রি) রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। অবশ্য কুয়ালালামপুরেই আমার কাছে যে গরম লাগে, এই মুকুট চুপিং শিগগির হারাতে পারে কুয়ালালামপুরের কাছে!
তিকিক তারপানাস এর পেছনে উঁকি দিচ্ছে বেশকিছু পাহাড়। রাস্তার দুপাশ এখন অতিকায় সব সেগুন গাছের দখলে। গরমে বেশ কাহিল লাগছে। পানিও শেষের পথে। চোখ দুটো শুধু জনপদ খুঁজছে। কিছুটা এগিয়ে এক জায়গায় দুটো বিশ্ববিদ্যালয়। রাস্তার এপাশে ইউনিভার্সিটি পারলিস মালয়েশিয়া, অন্যপাশে ইউনি সিরাজ। কলেবরে ইউনিভার্সিটি পারলিস মালয়েশিয়া বিশালাকৃতির। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে তেমন কোন দোকানপাটই নেই। একটু এগিয়ে উলু পহ-তে এসে আজকের দিনের মতো সত্যিকারের একটা জনপদ পাওয়া গেল। এগ্রো ফারমার নামে ছোট্ট একটা দোকানে থামলাম পানীয় জাতীয় কিছু দিয়ে গলা ভেজাতে। কোল্ড মাইলো নেওয়ার পরও শরীর মনে হচ্ছিল গ্লুকোজ চায়। অথচ সকাল থেকে চালিয়েছি সবে ২৮ কিলোমিটারের মতো। খানিক বাদেই নাসি আইয়াম অর্ডার করে সেটাই গলাধঃকরণ করলাম। দোকান চালানো দুই আন্টি বেশ যত্নের সাথেই খাওয়াল। আর এই দোকানের ভোক্তা যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা, তাই পকেটের রেস্ত ফুরানোর ভয় নেই।
মাইলো-লাঞ্চ পর্বের পর ফের সাইকেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ মাথায় পারলিস প্রদেশের বিখ্যাত হারুমানিস আমের ভাষ্কর্য। এই প্রদেশের তীব্র গরম হারুমানিস চাষে প্রচুর সাহায্য করে। এটিকে এই দেশের আমের রাজাও বলা হয়। এই আমের মৌসুম সেই জুনে শেষ হয়ে গেছে বলে আর চেখে দেখার সুযোগ পাওয়া গেল না এ যাত্রা। আমের ভাষ্কর্যের অল্প পরেই পারলিস প্রদেশ পেরিয়ে সাইকেলের চাকা রাখলাম কেদাহ প্রদেশে। আয়তন এবং জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে ছোটো প্রদেশ এই পারলিস।
মহাসড়ক ধরে কিছু এগিয়ে বুকিত কেচিকের অপেক্ষাকৃত ছোটো রাস্তা ধরলাম। মহাসড়কের ব্যস্ততা আমার মোটেও ভালো লাগে না। তবে একটু বাদেই বুঝলাম, সিদ্ধান্তটা খুব একটা সুবিধের হয়নি। এদিকে বেশকিছু চড়াই আছে। চড়াই ভাঙি আর আজকের গন্তব্য জিত্রা এর দিকে একটু একটু এগোই। শহরের দিকে যত এগোচ্ছি, ততই গাড়ির চাপ বাড়ছে রাস্তায়। আল-আলা নামক দারুণ সুন্দর একটা মসজিদ পড়ল পথে।
অল্প এগিয়ে পৌনে তিনটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম জিত্রাতে। আজকে পেরিয়েছি মোটে ৬০ কিলোমিটার পথ। কিন্তু এলিভেশন গেইন হয়েছে প্রায় ৩৩০ মিটার পথ। সন্ধ্যায় লোকাল ফেভারিট এক দোকানে ইয়োগার্ট কোন খেয়ে ফেরার পথে আমাদের দুজনের বাংলা কথোপকথন শুনে পাকড়াও করল এক বাংলাদেশি। জানতে চাইল, 'কী কাজ করেন আপনারা মালয়েশিয়াতে? দুজনের আর্মির মতো ফিগার। নিশ্চয় অনেক কষ্টের কাজ করেন।'
#Malaysia_on_wheels











