ঝরনার নাম কাই লো ভা

কাই লো ভা ঝরনা
পাড়া থেকে বেরিয়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটতেই ঝাঁ ঝাঁ রোদে দফারফা অবস্থা। অল্পদূরেই ট্রেইলের পাশে একটা জুমঘর দেখে সেখানেই কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেব বলে মনস্থির করলাম। মিনিট দশেক পরেই সবুজ পাহাড়ের জমিনে বাদামি জুমঘরটার কাছে ভিড়তেই বিকট আকৃতির দুটো কালো কুকুর গগনবিদারী চিৎকার শুরু করে দিল। মুখ দিয়ে উদ্ভট সব শব্দ করে কুকুর পটানোর নানারকম কায়দা-কসরত করেও খুব বেশি সুবিধা করতে না পেরে একসময় রণে ক্ষান্ত দিল রাশিক। বাইরে হট্টগোল শুনেই সম্ভবত ঘরের ওপাশটা থেকে বেরিয়ে এলেন জুমঘরের মালিক।
কানে গোঁজা ফুল দেখেই বুঝলাম দাদা ম্রো। আয়ুর মাপকাঠিতে তরুণ হলেও চেহারায় কঠোর শ্রমের ছাপ; চোখ দুটো মহামূল্যবান কোনো রত্নের মতো উজ্জ্বল। কথা বলার চেষ্টা করতেই অনুধাবন করলাম, দাদার বাংলা জ্ঞান শূন্যের কোঠায়। ইশারা-ইঙ্গিতে জানালাম, জুমঘরটায় ক্ষণিকের অতিথি হতে চাই আমরা। দাদা কুকুর দুটোকে ম্রো ভাষায় কী যেন একটা ধমক দিতেই ওরা রীতিমতো চুপসানো বেলুন হয়ে গেল। এই ফাঁকে আমরা কাঠের গুঁড়ি দিয়ে বানানো ছোট্ট সিঁড়িটা বেয়ে জুমঘরে উঠে পড়লাম।
জুমঘরটিকে রীতিমতো প্রকাণ্ডই বলা চলে। ঘরের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে সদ্যই কেটে আনা ধান। অন্যপাশে ফিরতেই দেখি, কয়েক জোড়া উৎসুক চোখ আমাদের দিকে চেয়ে আছে। ভাষার দূরত্বের কারণে চোখের অপরিমেয় কৌতূহল মুখে প্রকাশ করার জো নেই ওদের। জুমঘরের মালিকের পরিবারের সদস্য। দিনের প্রথম ভাগের কাজ শেষ করে সবেমাত্র দুপুরের খাবার নিয়ে বসেছে। দাদা ঘরে ঢুকেই ভাত নিয়ে বসলেন। ইশারা-ইঙ্গিতে আমাদেরও খেতে বললেন। পাড়া থেকে সকালে খেয়ে বেরিয়েছি, এটা জানাতেই একটু পরে গরম গরম ভুট্টা এলো আমাদের সামনে। ভুট্টা দেখেই আমি আর রাশিক হামলে পড়লাম। রেমদা ঘোষণা করলেন, এই কদিনে আমি আর রাশিক মিলে যত ভুট্টা খেয়েছি, একটা পূর্ণবয়স্ক ভালুকও এক মৌসুমে এতগুলো ভুট্টা খেতে পারে না!
‘কাই লো ভা’ নামক একটা মনোলোভা ঝরনাতে যাওয়ার ইচ্ছা আজ। ‘কাই লো ভা’ শব্দের অর্থ ‘যে ঝিরিতে মাছ উঠতে পারে না’
মুখে ভুট্টা নিয়েই রেমদার সঙ্গে আজকের গন্তব্য নিয়ে আলোচনা চালাতে লাগলাম। ‘কাই লো ভা’ নামক একটা মনোলোভা ঝরনাতে যাওয়ার ইচ্ছা আজ। ‘কাই লো ভা’ শব্দের অর্থ ‘যে ঝিরিতে মাছ উঠতে পারে না’। নাম শুনেই বুঝলাম, মনুষ্য প্রজাতির পাশাপাশি মীনকুলের জন্যও যথেষ্ট দুর্গম এই ঝরনার উৎসমুখের ঝিরিটি। রেমদা বারবার করে বলে দিলেন, ঝরনার নিচের দিকে নামাটা বেশ কঠিন। বেশ কিছুদিন আগে তলাংচাঁদপাড়ার এক ম্রো শিকারি এই ঝরনার ওপর থেকে পড়ে মারা গিয়েছেন। একটু পরেই হুড়মুড়িয়ে নামল বৃষ্টি। শরতের এই এক রূপ। ক্ষণে ক্ষণে আবহাওয়ার রূপবদল।
ঘণ্টাখানেক পর বৃষ্টি ধরে আসতেই ট্রেইলে নেমে পড়লাম। তলাংচাঁদপাড়ার লোকেরা এদিকের পাহাড়গুলোতে জুম চাষ করেছে এই মৌসুমে। তাই জুমের ফাঁক গলে সুন্দর ট্রেইল করা আছে। দুটো পাহাড় ডিঙানোর পর নিচের ঝিরিতে নেমে পড়ার পালা। লাল মাটির ট্রেইলটা কিছুক্ষণ আগের বৃষ্টিতে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আছে। অল্প এগোতেই দুই সারি বাঁশবাগানের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে সামনের দিকে এগিয়েছে পায়ে-চলা পথটা। মিনিট দশেক নামতেই নিচের ঝিরিতে গিয়ে পড়লাম।
এবার পাথরের বোল্ডার টপকানোর পালা। ঝিরির দুপাশে ঘন জঙ্গল ভেদ করে খাবলা খাবলা রোদ নেমেছে কিছু কিছু জায়গায়। খানিকটা যেতেই ঝিরিটা দ্বিধারায় বিভক্ত হয়ে গেল। ডানপাশের ঝিরিতে নামতেই দেখা মিলল সুন্দর একটা ক্যাসকেডের। কিছুক্ষণ গা ভিজিয়ে উঠে এলাম সেটার গোড়া থেকে। এবার এই ঝিরি ধরে নিচে নামতে হবে। তাহলেই দেখা মিলবে ‘কাই লো ভা’র। ঝিরির সুবিধাজনক একটা জায়গায় আমাদের ভারী ব্যাকপ্যাকগুলো খসিয়ে পিঠে শুধু ছোট ডে-প্যাকগুলো চাপিয়ে নিলাম।
সামনের বাঁক ঘুরতেই দেখি ছোটখাটো একটা পাথর ধসের এলাকা। সাবধানে পথটা পাড়ি দিলাম। আরও কয়েকটা বাঁক ঘুরে খানিকটা নিচের দিকে নামতেই নিজেদের আবিষ্কার করলাম ঝরনার ওপরে। এবার নিচে নামার পালা। রাশিকের ঝোলা থেকে রশি বের করে সামনের গাছটাতে বাঁধা হলো। কোনোরকমে একজন মানুষ যেতে পারে এমন একটা পথ। হাতের বামপাশে শ-দুয়েক ফুটের খাদ। হাত বা পা ফসকালেই নিচের পাথুরে জমিনে পড়ে আলুর দম হতে হবে। দড়ি ধরে আস্তে আস্তে নিচের দিকে এগোতে থাকলাম।
খানিক পরেই শুরু হলো পাশের পাহাড় থেকে খসে পড়া খুদে পাথরের চাঙড়ের এলাকা। দুয়েকটা হৃৎস্পন্দন মিস করে পৌঁছালাম একটা ছাউনির মতো অংশে। এখানেই প্রথম দেখা দিল ঝরনাটা। চারপাশের সবুজ বনানীর মধ্যে একখণ্ড সাদা ফেনিল ঢেউ যেন; উদ্দাম গতিতে নিচের ঝিরিতে পানি ঢেলেই চলেছে। অবিরত ধারায় ধাপে ধাপে গড়িয়ে নিচের ঝিরির দিকে এগোচ্ছে পানি।
ঝরনার নিচের দিকে এগোতেই খেয়াল করলাম, অতিকায় প্রাণীর প্রাগৈতিহাসিক ডিমের মতো দেখতে কিছু বিশালাকৃতি বোল্ডার থাকলেও বালু কিংবা নুড়িপাথর অনুপস্থিত। ঝিরি ধরে মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই ভয়াবহ পিচ্ছিল পাথুরে জমিনে আছাড় খেয়ে হাঁটুর ঠিক নিচে একটা আলু গজিয়ে ফেললাম। আর সামনে না এগিয়ে ঝরনার শেষ ধাপটায় এসে আবার ঝরনার নিচে মাথা এলিয়ে দিলাম। হঠাৎ গুড়ুমগুড়ুম শব্দে সংবিৎ ফিরে পেয়ে ওপরে তাকিয়েই দেখি, আবারও কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। তাড়াতাড়ি ফেরার পথ ধরলাম।
যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান গিয়ে চাঁদের গাড়ি বা লোকাল বাসে দার্জিলিং পাড়া পৌঁছাতে হবে। তারপর দুর্গম পাহাড়ি ট্রেইল ধরে হেঁটে ঝরনায় যেতে হবে।






