আগামীর সময়

বিশ্বের ৮ অপার্থিব সাগরসৈকত

বিশ্বের ৮ অপার্থিব সাগরসৈকত

সমুদ্রের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীল ঢেউ, সাদা ফেনা আর বালুর নরম রেখা। কিন্তু পৃথিবী এতটাই বৈচিত্র্যময় যে ‘সমুদ্রতট’ মানেই শুধু রোদ–পোড়া ছুটি নয় তার ভেতর লুকিয়ে আছে রহস্য, নীরবতা, খাঁটি সৌন্দর্য ও গল্পে ভরা অসংখ্য নিঃসঙ্গ উপকূল। কোথাও চাঁদের আলোয় জল ঝলসে ওঠে রূপোর মতো, কোথাও পাহাড়কাটা পথ ধরে নামতে হয় পুরনো কাহিনির উপসাগরে, কোথাও আবার মানুষহীন দ্বীপে কয়েক ঘণ্টা কাটানো মানে প্রকৃতিকে একা পাওয়ার সবচেয়ে কাছাকাছি অভিজ্ঞতা।

পৃথিবী ঘুরে বেড়ানো অভিজ্ঞ ভ্রমণকারীদের চোখে ধরা এমন আটটি সমুদ্রসৈকত— যেখানে গেলে মনে হবে, সমুদ্রকে আজই প্রথম দেখছেন। বিবিসি অবলম্বনে এই ৮ সৈকতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি পাঠকদের।

হ্যাভলক দ্বীপের চাঁদধোয়া সেই নির্জন তট


ভারতের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে গেলে বুঝবেন— সমুদ্রের নীল রঙেরও কত রকম শেড আছে। হ্যাভলক দ্বীপের ফুল মুন ক্যাফের পাশের ছোট্ট বিচটি যেন এক বিস্ময়ের কেন্দ্র। অগভীর পানিতে দিনের আলো যেমন নরম, রাতের চাঁদের আলো তেমনই অদ্ভুত স্বপ্নময়। সাদা বালুর ওপর হাঁটলেই মনে হবে পায়ের নিচে তুলোর মতো কিছু বিছানো আছে।

তালগাছের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা বাঁশের ছোট্ট ক্যাফেটি চালান স্থানীয় এক দম্পতি। কিন্তু খাবারের তালিকা দেখে মনে হবে শহরের কোনো আধুনিক রেস্তোঁরায় বসে আছেন, নিজেদের তৈরি এক রকমের ডেজার্টও পাবেন যা খেতে যেমন মজার, তেমনি দেখতে দারুণ। এখানকার সবচেয়ে ভালো দিক দ্বীপকে প্লাস্টিকমুক্ত রাখতে তরুণেরা যে নিরলসভাবে কাজ করছে, তা নিজের চোখে দেখলে আরও ভালো লাগে। এক লেখিকা তো এই বিচে বসেই তার বেস্টসেলার উপন্যাস লেখা শুরু করেছিলেন। প্রকৃতি, নীরবতা, খাবার আর মানুষের চেষ্টা— সব মিলিয়ে এই তট যেন মনকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়।

ইকাকোস: পুয়ের্তো রিকোর মানুষহীন স্বর্গদ্বীপ

পুয়ের্তো রিকোর উপকূল থেকে মাত্র ২০ মিনিটের নৌকা যাত্রা, আর আপনি পৌঁছে যাবেন ইকাকোস নামের ছোট্ট এক গোলাপি-নীল দুনিয়ায়। এখানে কোনো ঘর-বাড়ি নেই, দোকান নেই, কোলাহল নেই। শুধু সমুদ্রের হাওয়া, ফিরোজা পানি, আর সাদা বালুর উজ্জ্বল রেখা।

নৌকা আপনাকে নামিয়ে দিয়ে চলে যাবে, আবার চার ঘণ্টা পরে এসে তুলে নেবে। এই সময়টুকুতে সম্পূর্ণ দ্বীপ যেন আপনার একার। সঙ্গে খাবার, পানি, সানস্ক্রিন আর ছাতা অবশ্যই নিতে হবে— কারণ পুরো দ্বীপে এক ফোঁটা ছায়াও নেই। রোদের তাপে ত্বক পুড়ে যেতে পারে, তবে প্রকৃতির নির্জনতা ও শান্তির যে অনুভূতি পাবেন— তা সারাজীবন মনে গেঁথে থাকবে।

এল নিডো: ফিলিপাইনের নীল-সিল্ক পানির রাজ্য

পালাওয়ান দ্বীপের এল নিডো এমন এক জায়গা যেখানে গেলে মনে হবে পৃথিবীর বাইরে কোথাও চলে এসেছেন। বকুইট উপসাগরের চারদিকে চুনাপাথরের সুউচ্চ খাড়া পাহাড়, আর পানির রং একেক কোণে একেক রকম। স্থানীয় স্পিডবোটে করে বেরিয়ে পড়বেন। কখনো নির্জন লেগুনে সাঁতার, কখনো কায়াক চালানো, কখনো রঙিন মাছের ভিড়ে স্নরকেলিং। দুপুরে এক ফাঁকা উপসাগরে নোঙর ফেলে গাইডদের তৈরি ফিলিপিনো মাছ-মাংসের খাবার যেন পুরো দিনের ক্লান্তি উধাও করে দেবে। দিনশেষে লাস কাবানাস সমুদ্রতটে বসে সান মিগুয়েল বিয়ার হাতে সূর্যাস্ত দেখা গাঢ় লাল আকাশ আর সোনালি রোদ যেন সমুদ্রের পানিকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দেয়।

ইয়েরান্তো উপসাগর: ইতালির পুরনো কাহিনির মাঝে লুকানো নীলস্বপ্ন

ইতালির আমালফি আর সোরেন্তো উপদ্বীপের তটগুলো সাধারণত পাথুরে, কাঁকর–ভরা। কিন্তু এটাই তাদের সৌন্দর্য। নেরানো গ্রাম থেকে সরু পাহাড়ি পথে আড়াই কিলোমিটার নেমে গেলে ইয়েরান্তো উপসাগর সামনে খুলে যায়— কালি–নীল পানি, সবুজ পাহাড় আর ফিকে নীল আকাশের আশ্চর্য সংমিশ্রণ।

শোনা যায়, হোমারের কাহিনির সাইরেনদের বাস ছিল এই উপসাগরে— যাদের মায়াবী গান নাবিকদের পথভ্রষ্ট করত। এখন সেখানে শুধু শান্ত বাতাস আর জলের শব্দ। পাথুরে তট হওয়ায় জল পর্যন্ত পৌঁছাতে ওয়াটার শু নিলে ভালো হয়। অনেক সময় ভুলে যাবেন, তারপর গরম পাথরে দৌড়াতে–দৌড়াতে মুখভঙ্গি করতে হয়! তবুও এই দৃশ্য, এই নীরবতা— সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।

গ্র্যান্ড কেস: ফরাসি ক্যারিবিয়ানের নীল জল আর রসনার মেলবন্ধন

সেন্ট মার্টিনের গ্র্যান্ড কেস বীচ— নরম বালু, উষ্ণ ফিরোজা পানি আর দারুণ শান্ত পরিবেশ। সাঁতার কাটতে কাটতে মনে হয়, সমুদ্র যেন আপনাকে জড়িয়ে ধরে আছে।

কিন্তু আসল চমক লুকিয়ে আছে তটের পাশে। অল্প হাঁটলেই পাওয়া যাবে ফরাসি–ক্যারিবীয় খাবারের অসাধারণ সব জায়গা। হাঁসের লিভার, বুইয়াবেস থেকে শুরু করে তাজা লবস্টার পর্যন্ত। কখনো সাদামাটা শ্যাক, কখনো আড়ম্বরপূর্ণ রেস্তোঁরা— সবই হাতের কাছেই। তাই বলা যায় গ্র্যান্ড কেস শুধু সমুদ্রতট নয়, এটি রসনার এক উৎসব।
আকমেলভিক: স্কটল্যান্ডের নীরব সাদা উপসাগর

স্কটল্যান্ডে সমুদ্রতট? প্রথমে অদ্ভুত শোনালেও আকমেলভিক বীচে গিয়েই বোঝা যায়— এ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কত বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে। পাহাড়ঘেরা সাদা বালুর উপসাগরটি রোদ পেলে রঙ বদলায়— কখনো নীল, কখনো সবুজ।

গ্রীষ্মে কিছু পরিবারকে সাঁতার কাটতে দেখা যায়, তবে বসন্ত আর শরতে পুরো উপসাগর প্রায় ফাঁকা থাকে। আবহাওয়া খুব দ্রুত বদলায়— সূর্যাস্তের শান্তির পরই হঠাৎ ঝড় নেমে আসতে পারে। পাহাড়ি পথ ধরে সেখানে পৌঁছানোর যাত্রাই এত সুন্দর— পথে লোখইনভারের বিখ্যাত পাই–দোকানে থেমে নিলে পুরো যাত্রা আরও আনন্দময় হয়ে ওঠে।

ব্রাইটন বীচ: নিউ ইয়র্কের ছোট্ট বহুসংস্কৃতির সমুদ্রজগৎ

নিউ ইয়র্কের কনি আইল্যান্ডে ভিড়ভাট্টা দেখে ক্লান্ত হলে একটু এগোলেই পাবেন ব্রাইটন বীচ। যাকে অনেকে বলেন ‘লিটল ওডেসা’। এখানে রাশিয়ান, ইউক্রেনীয় ও মধ্য এশিয়ার উইগুর জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বসতি। তাই এই উপকূলে হাঁটলেই মনে হয়— নানা সংস্কৃতি, ভাষা আর কাহিনির মিলনমেলা চলছে।

বোর্ডওয়াক ধরে হাঁটলে দেখবেন কেউ লোকসংগীত বাজাচ্ছে, কেউ হাতে বানানো ডাম্পলিং বিক্রি করছে, কেউ আবার সমুদ্রের হাওয়ায় গল্পে মগ্ন। সাঁতার শেষে তুর্কি কাবাব, জর্জিয়ান খাবার, উইঘুরি নুডল— সবই কয়েক কদম দূরে। ব্রাইটন বীচ তাই একসঙ্গে সমুদ্র–ভ্রমণ ও সংস্কৃতি–অভিযান।

বে অফ ফায়ার্স: তাসমানিয়ার লাল পাথরের আগুন রাঙা উপকূল

তাসমানিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলে ৫০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত বে অফ ফায়ার্স— সাদা বালু, স্বচ্ছ নীল পানি আর কমলা–লাল রঙে রাঙা গ্রানাইট পাথর মিলিয়ে এক অপার সৌন্দর্য তৈরি করেছে। ঢেউয়ের গর্জন আর হাওয়ার তাপমাত্রা— সব মিলে এখানে দাঁড়ালে মনে হয় পৃথিবীর একদম শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছেন।

মানুষের ভিড় নেই বললেই চলে। হাঁটতে–হাঁটতে হঠাৎ দেখবেন খোলা আকাশে একটি অ্যালবাট্রস উড়ছে, অথবা তটে ছড়িয়ে আছে সি–উইডের ফিতে। একবার পানিতে নামলে ঠান্ডায় নিঃশ্বাস আটকে যেতে পারে, কিন্তু ওঠার পর যে নিস্তব্ধতা ও বিস্ময় আপনাকে ঘিরে ধরে তা সত্যিই অন্য রকম। এখানে দাঁড়িয়ে অনুভব করা যায়, পৃথিবীর কত জায়গাই এখনও মানুষের স্পর্শে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

    শেয়ার করুন: