টাঙ্গুয়ায় জলছবিতে আঁকা বন্ধুদের আড্ডা

টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ‘বহুমাত্রিকে’র সদস্যরা
আকাশ কখনো কালো মেঘে ঢাকা, কখনো তীব্র ঝলমলে রোদ, কখনোবা সেই মেঘের বুক চিরে বিদ্যুতের চিকন রেখা। দূরে সাদা মেঘের ভেলা, নিচে স্থির জলরাশি—মনে হচ্ছিল, আকাশটা যেন ধীরে ধীরে নেমে এসেছে হাওরের জলের কাছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের আবহাওয়া এমনই—এক মুহূর্তে বৃষ্টি, পরক্ষণেই রোদ। প্রকৃতি এখানে যেন কোনো পূর্বাভাস মানে না; নিজের মতো গল্প লেখে।
আমাদের গল্পটাও শুরু হয়েছিল একটু এলোমেলোভাবেই। অনেকদিন ধরে ট্যুরটা নিয়ে পরিকল্পনা চলছিল। এবারের আয়োজনের মূল দায়িত্বে ছিলেন সৈয়দ রশীদুল হাসান শিমুল ভাইয়া। টিম গুছিয়ে নেওয়া, টিকিট, বুকিং—সবকিছু তিনি আগেই ঠিকঠাক করে রেখেছিলেন। আমরা সবাই ঢাকা থেকেই যাত্রা শুরু করেছিলাম। যাওয়ার দিন হঠাৎ খবর এলো, বাসের সময় আধা ঘণ্টা এগিয়ে আনা হয়েছে, যাতে সময়মতো বোটে উঠতে পারি। খবর শুনেই সবাই রীতিমতো প্যানিক! অফিস শেষ করে যে যার জায়গা থেকে ছুটে বের হলাম। সবচেয়ে বিপদে পড়েছিলাম আমি, শাহরিয়ার আর শেখ সাব্বাব আল দিন কাব্য। শেষ পর্যন্ত বাকি বন্ধুরা কোনোভাবে বাসটাকে আটকে রাখার চেষ্টা করলেও অন্য যাত্রীরা আপত্তি করছিলেন। বাস ছেড়ে দেওয়ার পরই আমরা দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়লাম।
বাসের একেবারে শেষের স্লিপার সিটে আমি আর শাহরিয়ার। রাস্তার অবস্থা এমন, প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল দোতলা থেকে নিচে পড়ে যাব! শুরুটাই যখন এমন অ্যাডভেঞ্চারে, তখন বুঝেই গিয়েছিলাম—এই ট্যুর সাধারণ হবে না। যাত্রাপথে বিরতিতে নেমে সবাই একটু কথা বললাম, হালকা কিছু খাওয়ার চেষ্টা করলাম। অফিস থেকে তাড়াহুড়ো করে বের হওয়ায় সবাই ভীষণ ক্ষুধার্ত ছিলাম। কিন্তু খাবার অর্ডার দিয়ে বসে থাকতেই আবার লেট! হোটেলে ভিড় থাকায় খাবার আসতে দেরি হচ্ছিল, আর ফিরে যেতে দেরি হওয়ায় বাসের লোকজনও আমাদের ওপর বিরক্ত হচ্ছিলেন। এর মাঝেই রামিম মজা করে আলিশা ফোনে কীভাবে ফিসফিস করে কথা বলে তা অভিনয় করে দেখাচ্ছিল, আর আলিশাও পাল্টা দেখাচ্ছিল বাসের ঝাঁকুনির মধ্যেও রামিম কীভাবে জোরে জোরে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিল। হাসাহাসিতে বিরতিটাও স্মরণীয় হয়ে গেল।
সুনামগঞ্জ নতুন বাসস্ট্যান্ডে নেমে লেগুনা চেপে আনোয়ারপুর ঘাটে পৌঁছে যথাসময়ে পা রাখলাম আমাদের হাউস বোটে। নান্দনিক সেই হাউস বোটই হয়ে উঠল দুই দিনের জন্য আমাদের বহুমাত্রিক বন্ধুদের ভাসমান বাড়ি।
‘বহুমাত্রিক’ শুধু ভ্রমণপাগল বন্ধুদের একটি দল নয়; সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আর্থসামাজিক নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত একটি সংগঠন। এই সংগঠনের বন্ধুরা নানা গুণে গুণান্বিত, আর তাদের অনেকেরই দেশের আনাচকানাচ ঘুরে দেখার আলাদা নেশা আছে। দশটা পরিকল্পনা করলে তার একটি সফল হওয়াই যেন আমাদের চিরাচরিত নিয়ম! তবুও কিভাবে যেন টুক করে এই ট্যুরের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ পেল। দলের অনেকেই ছিলেন নতুন; দু-একজনের সঙ্গে আগে পরিচয় থাকলেও সবার সঙ্গে একসঙ্গে এমন ভ্রমণ ছিল এই প্রথম।
প্রথম গন্তব্য তাহিরপুরের শিমুল বাগান। একটা নাচ শুট করব এবং ঘোড়ায় চড়ব ভেবে খোপায় ফুল, হালকা সাজ, লাল শাড়ি ধুতি স্টাইলে জড়িয়ে চলে গিয়েছিলাম। সবুজের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলগাছ, খোলা আকাশ আর প্রকৃতির মায়ায় জায়গাটা যেন ছবির মতো। ঘোড়ায় চড়ে ঝাঁসির রানির সাজে কিছুটা ইতিহাসের চরিত্র হয়ে গেলাম। ছবি, হাসি, ঘোরাঘুরি—সব চলছিল দারুণ। শুধু বৃষ্টির কারণে বহুল প্রত্যাশিত নাচটা আর রেকর্ড করা হলো না। মনটা একটু খারাপ হয়েছিল ঠিকই, তবে বৃষ্টি, আমার সেই দিনের গল্পে, ক্যামেরার ছবিতে যেন আলাদা রং যোগ করে দিল।
প্রকৃতি আর ইতিহাস—ভ্রমণে এই দুই জগতই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। প্রকৃতির সামনে দাঁড়ালে মনটা সহজ হয়ে যায়, আর ইতিহাসের কোনো স্থান বা চরিত্রের কাছে গেলে মনে হয়, বহুদিন আগের কোনো গল্পের দরজা হঠাৎ খুলে গেছে। ছোটবেলা থেকেই রাজা-রানির গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। ইতিহাসের প্রতি এই টানটা হয়তো সেখান থেকেই।
এরপর গেলাম জাদুকাটা নদীতে। দূরে পাহাড়, মাথার ওপর ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, আর একটি ফুটবল নিয়ে পানিতে নেমে অনেকক্ষণ খেলাধুলা, হাসি, কলকল, লাইফ জ্যাকেট পরে ডুব দেওয়া আর সাঁতারের বৃথা চেষ্টা—সবার জন্যই ছিল অনেক দিন পরে এমন ছেলেমানুষি আনন্দ। পানি ছাড়ার ইচ্ছা না থাকলেও সবার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত উঠতেই হলো। কারণ আমরা না উঠলে বোট বারিক্কা টিলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করতে পারছিল না।
ঘাটে নেমে মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠে গেলাম বারিক্কা টিলা। এ যেন পাহাড়, মেঘ, পানি, জঙ্গলের এক মেলবন্ধন। ভীষণ ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মোটরসাইকেল মামার ডাকাডাকিতে আর হারিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। কয়েকটি ছবি তুলেই শুরু করলাম মিনি সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা। জায়গাটির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য যেন নামকরণের সার্থকতা জানান দেয়।
এরপর বর্ডারের পাশের ছোট্ট বাজার থেকে চকোলেট, ড্রিংকস কিনে যখন বোটের দিকে ফিরছি, তখনই ট্যুরে যোগ হলো এক টুকরো অপ্রত্যাশিত অ্যাডভেঞ্চার। শাহরিয়ারের পা পিছলে কাঠের গুড়ি নড়ে যেতেই আমরা দুজন একসঙ্গে ধপাস! মুহূর্তের মধ্যে আমার পা দুই গুড়ির মাঝখানে আটকে গেল। সবাই ছুটে এসে উদ্ধার করল। পরে অ্যান্টিসেপটিক বামও জুটল। ব্যথা খুব একটা লাগেনি; বরং এমন ছোট্ট দুর্ঘটনাও স্মৃতির খাতায় মজার এক ফুটনোট।
রাত নামল নীলাদ্রির জলরাশির পাশে। গ্রাম ঘোরা, টুকটাক কেনাকাটা, খিচুড়ি, ভর্তা, মাছ, চা আর স্ন্যাক্সের ফাঁকে গান, আড্ডা। বিশেষ করে ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার আর প্রশ্নোত্তর রাউন্ডটা ছিল মজার। সবার ব্যক্তিগত জীবনের নানা মজার গল্প, স্বভাব, স্টাইল, এমনকি প্রেমের জীবন নিয়েও টুকটাক জানা হয়ে গেল। কেউ হাসছিল, কেউ লজ্জা পাচ্ছিল, কেউ আবার নিজের অজানা কোনো গল্প বলে সবাইকে চমকে দিচ্ছিল। অচেনা মানুষগুলোকে চিনে নেওয়ার জন্য এর চেয়ে মজার উপায় আর কী হতে পারে!
রাত আরও গভীর হলে আমরা কয়েকজন বোটের ছাদে উঠে বসেছিলাম। চারপাশে সারি সারি বোট, প্রতিটি বোটে আলাদা আলাদা আলো; কোথাও কেউ কার্ড খেলছে, কোথাও গান হচ্ছে, কোথাও গল্প। হাওরের জলের ওপর ভাসতে থাকা সেই আলো, রাতের বাতাস আর চারপাশের নীরবতার মধ্যে মানুষের ছোট ছোট আনন্দ—দৃশ্যটা আমার আগে কখনো দেখা হয়নি। এত ভালো লেগেছিল যে সেই রাতেও অনেক ছবি তুলেছি, ভিডিও করেছি।
দ্বিতীয় দিনে সকালটা শুরু হয়েছিল একটা ছোট্ট আশা নিয়ে। গতকাল বৃষ্টির কারণে নাচটা রেকর্ড করতে পারিনি। তাই আজ অন্তত একটা নাচ রেকর্ড করবই। সকালে উঠে রেডি হয়ে গেলাম। কিন্তু সঙ্গ দেওয়ার মতো কেউ রেডি না হওয়ায় আবার অপেক্ষা। শেষ পর্যন্ত সেই নাচটাও আর সম্পূর্ণ করা হলো না। আফসোসটা তাই রয়ে গেল—হয়তো এই অসম্পূর্ণ নাচই আবার টাঙ্গুয়ার হাওরে ফিরে যাওয়ার একটা অজুহাত হয়ে থাকবে।
এবার আমরা রওনা দিলাম লাকমা ছড়ার উদ্দেশ্যে। ছোট্ট একটা জায়গা, কিন্তু আমার কাছে পুরো ট্যুরের সবচেয়ে সুন্দর আবিষ্কার। ছোট্ট জলপ্রপাত, সামনে ছড়িয়ে থাকা নানা পাথর, স্বচ্ছ পানি আর চারপাশে সবুজ—সবকিছু মিলিয়ে যেন প্রকৃতির অতি যত্নে আঁকা ছোট্ট এক ছবি।
এরপর দুপুরে গেলাম নীলাদ্রিতে। সময়টা হয়তো আদর্শ ছিল না; সকাল কিংবা বিকেল হলে সৌন্দর্যটা আরও অন্যরকমভাবে উপভোগ করা যেত। কিন্তু জায়গার সৌন্দর্য সময়ের হিসাব মানে না। নীল আর সবুজ একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেন এক উপচে পড়া মুগ্ধতা।
পরের গন্তব্য ওয়াচ টাওয়ার আর হিজলবন। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে পাশে তাকাতেই মনে হলো, আকাশ আর পানি যেন একে অপরকে ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পানির মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল গাছগুলো দৃশ্যটাকে কিছুটা রহস্যময় করে তুলছিল।
এই ট্যুরের আসল সৌন্দর্য শুধু টাঙ্গুয়ার হাওরের জলে-আকাশে ছিল না; ছিল আমাদের মানুষগুলোর মধ্যেও। বহুমাত্রিকের বন্ধুরা যেন একসঙ্গে থাকলেই নিজেদের আলাদা আলাদা মাত্রা নিয়ে একটি পূর্ণ গল্প হয়ে ওঠে। আমরা গান গেয়েছি, নেচেছি, খেয়েছি, গল্প করেছি, হাসাহাসি করেছি—এক কথায় দারুণ সময় কেটেছে। জায়গা যত সুন্দরই হোক, বন্ধুরা পাশে না থাকলে সেই সৌন্দর্য যেন পুরোপুরি পূর্ণতা পায় না।
শিমুল ভাইয়া ছিলেন পুরো টিমের গার্ডিয়ান। ক্যামেরাম্যান কাব্যর ক্যামেরা বৃষ্টি আর রোদে প্রদর্শনের বস্তু হয়েই রইল। আর চিকেন ছাড়া তার পৃথিবী অসম্পূর্ণ। আলিশার ক্ষুধা ছিল ট্যুরের আরেক মজার অধ্যায়। এতটুকু কিউট একটা মেয়ে, অথচ খেয়ে উঠেই আবার ক্ষুধার খোঁজ! কী খাব, কী খাব—যা দেখছে তাই খাওয়ার তালিকায় যোগ করছে। খাওয়ার পরও ‘আবার খিদে পেয়েছে’—এই ঘোষণা দিয়ে সে পুরো ট্যুরটাকেই নিজের ক্ষুধার গল্পে মাতিয়ে রেখেছিল। বর্ণালির দীর্ঘ সাজগোজ, রামিমের ঘুম আর চিলের নিজস্ব রুটিন—সব মিলিয়ে ট্যুরে ছিল আলাদা আলাদা চরিত্রে এক মজার গল্প।
ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ারের পর সিরাজুল ইসলাম সিরাজও আমাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন পুরো দমে। বিয়ের পর আমার আর শাহরিয়ারের প্রথম গ্রুপ ট্যুর। তাই আমাদের জন্যও কিছুটা বিশেষ।
পুরো ট্যুরে একটা বিষয় আমাকে বারবার অবাক করেছে। কোনো স্পটে পেশাদার ফটোগ্রাফার চোখে পড়েনি। অথচ ছোট ছোট স্থানীয় বাচ্চারা আমাদের ফোনে এত নিখুঁত ছবি আর ভিডিও তুলে দিচ্ছিল, মনে হচ্ছিল, ক্যামেরার পেছনে এমন ছোট্ট ছোট্ট অনেক শিল্পীকে টাঙ্গুয়ার হাওর লুকিয়ে রেখেছে।
সব মিলিয়ে এই ট্যুরে যেন একের পর এক সুন্দর মুহূর্ত। আমি অনেক ছবি তুলেছি, অনেক ভিডিও করেছি, শুধু সেই অসম্পূর্ণ নাচটার আফসোসটা রয়ে গেছে। তবু সেই আফসোসও যেন খারাপ লাগার নয়; বরং মনে মনে বলে—আবার যাওয়া দরকার।
ভ্রমণ শেষে কাজের উদ্যমটাও যেন নতুন করে ফিরে আসে। মনে হয়, মাথার ভেতর জমে থাকা ক্লান্তি একটু সরে গেছে; সামনে থাকা কাজগুলোকে আবার নতুন উৎসাহে দেখা যায়। প্রকৃতির কাছে যাওয়া তাই আমার কাছে শুধু বেড়ানো নয়, নিজেকে আবার নতুন করে খুঁজে পাওয়ারও এক উপায়।
আর এই আনন্দটা আরও বাড়ে যখন সঙ্গে থাকে বহুমাত্রিকের বন্ধুরা। বহুমাত্রিকের এমন আয়োজন চলতেই থাকুক, নতুন নতুন জায়গা আমাদের ডাকতে থাকুক, আর আমরা সুযোগ পেলেই দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রকৃতি, ইতিহাস আর মানুষের গল্প আবিষ্কার করতে বেরিয়ে পড়ি—এই চাওয়াটুকু থাকুক।
বরাবরের মতোই ফেরার সময় উদাসীনতার গ্রাসে মন ভার। যাওয়ার সময় যে উত্তেজনা ছিল, ফেরার সময় সেখানে জন্মেছিল মায়া। যাওয়ার সময় আমি খুঁজছিলাম নতুন এক জায়গা। ফেরার সময় নিয়ে ফিরলাম নতুন কিছু মানুষ, অসংখ্য হাসি, এক অসম্পূর্ণ নাচ, বৃষ্টিভেজা বিকেল, জলের ওপর ভেসে থাকা রাত, প্রকৃতির কিছু অনির্বচনীয় ছবি আর এক মুঠো স্মৃতি।
হয়তো ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর দিক এটাই—কোনো জায়গা থেকে ফিরে এসেও মনে হয়, গল্পটা আসলে শেষ হয়নি। বরং সেই জায়গার আকাশ, পানি, সবুজ, রাতের আলো আর মানুষগুলো মনের ভেতর থেকে আবার ডাকতে থাকে। আর তখন ফিরে যাওয়ার ইচ্ছেটাই হয়ে ওঠে সুন্দর এক পরিসমাপ্তি।






