আগামীর সময়

নাসার রকেটে ৫৩ বছর পর চাঁদের বুকে ফিরছে মানুষ

নাসার রকেটে ৫৩ বছর পর চাঁদের বুকে ফিরছে মানুষ

রাতের আকাশে যখন চাঁদ তার রহস্যময় আলোয় পৃথিবীর বুকে ছায়া ফেলে, তখন মানুষের হৃদয়ে জেগে ওঠে এক অদম্য ডাক। সেই ডাক- যা হাজার বছর ধরে রূপকথায়, কবিতায়, গানে বেজে চলেছে।

আর সেই অদম্য ডাকের তাড়নায় ১ এপ্রিল ২০২৬, ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ প্যাড ৩৯বি-তে দাঁড়িয়ে আছে এক স্বপ্নের বাহন। নাসার স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেটের ৩২২ ফুট উঁচু দেহে জ্বলে উঠবে অগ্নিশিখা।

চারজন নভোচারী; রেইড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেন- তাদের হৃদয়ের স্পন্দনে মিলিয়ে নিচ্ছেন মহাকাশের অসীমতা। আর্টেমিস টু মিশন আজ উড়ছে। চাঁদের দিকে। মানুষের ফিরে আসার যাত্রায়। এ যেন কবিতার পঙক্তি নয়, বাস্তবের গর্জন। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বে যেখানে কোনো মানুষ ৫৩ বছর ধরে পা রাখেনি, সেখানে আজ নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে।

এই মিশন শুধু একটি রকেট উৎক্ষেপণ নয়। এটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই, যখন নিল আর্মস্ট্রং আর বাজ অলড্রিন অ্যাপোলো ১১-এর লুনার মডিউলে চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিলেন, তখন পুরো বিশ্ব যেন শ্বাস বন্ধ করে দেখেছিল। “এক ছোট্ট পদক্ষেপ মানুষের জন্য, কিন্তু এক বিশাল লাফ মানবজাতির জন্য”- আর্মস্ট্রং-এর সেই কথা আজও প্রতিধ্বনিত হয়।

অ্যাপোলো প্রোগ্রামের মাধ্যমে নাসা ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে ছয়টি সফল ক্রুড ল্যান্ডিং করেছিল। অ্যাপোলো ১২, ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৭- প্রত্যেকটিতে নভোচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন, বিজ্ঞানের নতুন দুয়ার খুলেছেন। অ্যাপোলো ১৭-এর ইউজিন সার্নান এবং হ্যারিসন শ্মিট ছিলেন চাঁদের মাটিতে শেষ মানুষ।

১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে তারা ফিরে আসার পর চাঁদের নীরবতা ফিরে এসেছিল। কোল্ড ওয়ারের প্রতিযোগিতা শেষ, অর্থনৈতিক চাপ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ- সব মিলিয়ে মানুষ চাঁদ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল।

কিন্তু স্বপ্ন মরে না। ২০১৭ সালে নাসা আর্টেমিস প্রোগ্রাম ঘোষণা করে। গ্রিক দেবী আর্টেমিসের নামে—যিনি চাঁদের দেবী, দেবতা অ্যাপোলোর বোন। লক্ষ্য শুধু চাঁদে যাওয়া নয়, সেখানে স্থায়ী বসতি গড়া। মঙ্গল গ্রহের পথ প্রস্তুত করা।

প্রথম ধাপ ছিল আর্টেমিস ওয়ান। ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর, মানববিহীন মিশন হিসেবে এসএলএস রকেট ও অরিয়ন স্পেসক্রাফট চাঁদের চারপাশে ঘুরে এসেছিল। ২৫ দিনের যাত্রায় অরিয়নের হিট শিল্ড, লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, নেভিগেশন—সবকিছু পরীক্ষিত হয়েছিল। সফলতার পর এবার আর্টেমিস টু। আর্টেমিস যুগের প্রথম মানব মিশন।

চারজন নভোচারীকে নিয়ে চাঁদের ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরিতে যাত্রা। ল্যান্ডিং নয়, কিন্তু চাঁদের ৪ হাজার ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে ঘুরে আসা। মিশনের সময়কাল প্রায় ১০ দিন।

আজকের লঞ্চ উইন্ডো খুলছে ফ্লোরিডার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে। আবহাওয়া অনুকূলেই রয়েছে বলে জানিয়েছে নাসা। ফলে ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে বুধবারই উৎক্ষেপণের। রকেটের কোর স্টেজে চারটি আরএস-২৫ ইঞ্জিন, দুটি সলিড রকেট বুস্টার রয়েছে- মোট থ্রাস্ট ৮৮ লাখ পাউন্ড। যা অ্যাপোলো যুগের স্যাটার্ন ভি-এর চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি শক্তিশালী। অরিয়ন স্পেসক্রাফট- যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইনটেগ্রিটি’ চারজনকে বহন করবে। এটি নাসার নতুন প্রজন্মের ক্রু ক্যাপসুল। অ্যাপোলো কমান্ড মডিউলের চেয়ে আরও উন্নত, আরও নিরাপদ।

মিশনের চার ক্রু অসাধারণ। কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যান; নৌবাহিনীর টেস্ট পাইলট, আইএসএস-এ ২০১৪ সালে ছয় মাস কাটিয়েছেন। স্পেসওয়াক করেছেন, রেকর্ড পরিমাণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়েছেন। তিনি নাসার সাবেক চিফ অ্যাস্ট্রোনট।

পাইলট ভিক্টর গ্লোভার; প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী যিনি ডিপ স্পেসে যাচ্ছেন। স্পেসএক্স ক্রু ড্রাগনের প্রথম অপারেশনাল ফ্লাইটে পাইলট ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে চার সন্তানের বাবা।

মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ; প্রথম নারী যিনি চাঁদের কক্ষপথের বাইরে যাবেন। আইএসএস-এ রেকর্ড ৩২৮ দিন কাটিয়েছেন। ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী। আর জেরেমি হ্যানসেন- কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির মহাকাশচারী। রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের ফাইটার পাইলট। আর্টেমিস অ্যাকর্ডসের অংশীদার হিসেবে কানাডা প্রথমবার চাঁদের মিশনে নভোচারী পাঠাচ্ছে।

এই ক্রু ডাইভার্সিটির প্রতীক। নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, আন্তর্জাতিক—আর্টেমিস প্রোগ্রামের প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে।

মিশনের উদ্দেশ্য গভীর। অরিয়নের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম প্রথমবার ক্রুসহ পরীক্ষা। রেডিয়েশন, মাইক্রোগ্র্যাভিটি, ডিপ স্পেস কমিউনিকেশন- সবকিছু পরীক্ষিত হবে। চাঁদের ফার সাইডে যাওয়ার সময় কমিউনিকেশন ব্ল্যাকআউট হবে। ক্রুরা চাঁদের ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণ করবেন, ভবিষ্যতের ল্যান্ডিং সাইট নির্ধারণে সাহায্য করবেন। আর্টেমিস থ্রি-এ চাঁদে ল্যান্ডিং হবে—প্রথম নারী এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী চাঁদে পা রাখবেন। তারপর গেটওয়ে স্টেশন, লুনার বেস ক্যাম্প। মঙ্গলের পথ।

এই মিশনের ফেলে আশা পথ সহজ ছিল না। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ ২০২৬-এ হাইড্রোজেন লিক এবং হিলিয়াম প্রেসারাইজেশন লাইনের সমস্যায় লঞ্চ পিছিয়ে যায়। রকেট হ্যাঙ্গারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ২০ মার্চ আবার প্যাডে রোলআউট। কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। আজ লঞ্চ টিমের প্রস্তুতি চূড়ান্ত। ক্রু স্যুট পরে অরিয়নে উঠবেন। প্রতিটি সেকেন্ড মনিটর করা হচ্ছে।

আর্টেমিস টু-এর টাইমলাইন অসাধারণ। লঞ্চের পর ৮ মিনিটে এসএলএস কোর স্টেজ সেপারেট। ইন্টারিম ক্রায়োজেনিক প্রপালশন স্টেজ (আইসিপিএস) দুইবার ফায়ার করে অরিয়নকে হাই-আর্থ অরবিটে পাঠাবে। তারপর ট্রান্স-লুনার ইনজেকশন। চাঁদের কাছাকাছি যাওয়ার আগে ক্রুরা সিস্টেম চেক করবেন। চাঁদের ফ্লাইবাইয়ের সময় তারা চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করবেন- যেখানে ভবিষ্যতে ওয়াটার আইস খুঁজে বের করা হবে।

ফিরতি পথে পৃথিবীতে পুনরায় প্রবেশের সময় অরিয়নের হিট শিল্ড ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা সহ্য করবে এবং সব ঠিক থাকলে ক্যাপসুল প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে।

এই মিশনের গুরুত্ব অপরিসীম। অ্যাপোলো যুগে প্রযুক্তি ছিল সীমিত। আজ এআই, অটোনোমাস নেভিগেশন, অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়াল- সবকিছু নতুন। আর্টেমিস অ্যাকর্ডসে ৪০টির বেশি দেশ অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এটি অনুপ্রেরণা। মহাকাশে শান্তিপূর্ণ সহযোগিতা। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা- সবক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে।

মহাকাশচারীরা যখন চাঁদের ফার সাইডে যাবেন, তখন পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সেই নীরবতায় তারা একা একা চাঁদ দেখবেন। হয়তো ভাববেন- আমরা কতটা ছোট, কিন্তু কত বড় স্বপ্ন দেখি।

ক্রিস্টিনা কোচ বলেছেন, “আমরা শুধু পর্যবেক্ষণ করব না, ভবিষ্যতের ক্রুদের জন্য পথ তৈরি করব।” ভিক্টর গ্লোভার বলেন, “এটি শুধু আমাদের নয়, পুরো মানবজাতির যাত্রা।”

আর্টেমিস টু সফল হলে আর্টেমিস থ্রি যাবে চাঁদে ল্যান্ডিং ২০২৮-এর দিকে। তারপর গেটওয়ে স্টেশন। লুনার সারফেস প্ল্যাটফর্ম। মঙ্গলের মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতি। এ যেন অ্যাপোলোর উত্তরাধিকার। কিন্তু আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, আরও টেকসই।

আজকের এই লঞ্চের দিকে তাকিয়ে বিশ্ব অপেক্ষায়। বাংলাদেশের আকাশেও হয়তো অনেক যুবক-যুবতী চোখ রাখে টেলিস্কোপে। তারা স্বপ্ন দেখে একদিন আমরাও মহাকাশে যাওয়ার। বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের অবদানও বাড়বে। নাসার সঙ্গে সহযোগিতা, শিক্ষা প্রোগ্রাম- সবই সম্ভব।

চাঁদের আলো আজ আরও উজ্জ্বল। রকেটের ধোঁয়ায় বড় হবে মানুষের হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন।

আর্টেমিস টু মিশনের এসএলএস রকেট উড়ছে। চাঁদ ডাকছে। মানুষ ফিরছে। এই যাত্রা শুধু আকাশে নয়, হৃদয়েও। এক নতুন ভোরের সূচনা। মহাকাশের অসীমে মানবতার জয়গান।

    শেয়ার করুন: