বিশ্বকাপে মাঠ মাতাবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বলের ভেতরের খুদে চিপ থেকে শুরু করে মাঠের এআই সেন্সর এবং সম্প্রচারের ক্লাউড প্রযুক্তি— সবকিছু মিলিয়ে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে মানুষের মেধা, ক্রীড়াশৈলী ও প্রযুক্তির এক অনন্য নিদর্শন। বিস্তারিত জানাচ্ছেন ইমরানুর রহমান
খেলোয়াড় পরিষ্কার অফসাইডে ছিলেন, তাও রেফারি গোল দিয়ে দিলেন! বিশ্বকাপে এমন বিতর্ক আর সমর্থকদের ক্ষোভ যেন ফুটবল মাঠের চিরচেনা রূপ। আবার গ্যালারিতে বসে প্রচণ্ড গরমে দর্শকদের হাঁসফাঁস করার দৃশ্যও বেশ পরিচিত। তবে এবার প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে চেনা সেই ফুটবল মাঠ। মাঠের ভুলত্রুটি কমানো আর দর্শকদের স্বস্তি দেওয়ার মতো নানা সমস্যার দারুণ সব প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রযুক্তি সংস্থা এবং ফিফার অফিসিয়াল তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের বিশ্বকাপ আগের যেকোনো আসরের চেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে অনেক বেশি এগিয়ে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল।
এবারের আসরে মাঠের ভেতরের সবচেয়ে বড় চমক বলের ভেতরে থাকা একটি বিশেষ ‘স্মার্ট চিপ’। বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান এডিডাস এবং জার্মানির প্রযুক্তি কোম্পানি কিনেক্সন যৌথভাবে এটি তৈরি করেছে। বলের ঠিক মাঝখানে বসানো এই সেন্সরটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার করে বলের গতি, ঘূর্ণন এবং খেলোয়াড়দের সামান্যতম স্পর্শের লাইভ তথ্য ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর রুমে পাঠিয়ে দেবে। চিপটি এতটাই নিখুঁত যে, অফসাইডের মুহূর্তে ঠিক কোন মিলি-সেকেন্ডে বলে লাথি মারা হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে ধরে ফেলবে।
এই বল ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সঙ্গে চমৎকার যুগলবন্দি ঘটাবে নতুন যুগের ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড’ প্রযুক্তি। এর জন্য স্টেডিয়ামের ছাদের নিচে এক ডজনের বেশি বিশেষ ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এ ক্যামেরাগুলো বলের পাশাপাশি মাঠে থাকা প্রতিটি খেলোয়াড়ের শরীরের ২৯টি জয়েন্ট পয়েন্ট প্রতি সেকেন্ডে ৫০ বার ট্র্যাক করবে। খেলোয়াড়দের হাত, পা, হাঁটু বা কাঁধের মতো অঙ্গগুলোর অবস্থান দেখেই মূলত অফসাইড নিখুঁতভাবে ধরা হবে। বলের ভেতরের চিপ এবং ক্যামেরার এই দুই তথ্য একসঙ্গে হিসাব করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে থেকেই অফসাইডের একটি থ্রিডি অ্যানিমেশন তৈরি করে ফেলবে। রেফারি সিদ্ধান্ত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই চমৎকার অ্যানিমেশনটি স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় এবং টিভির দর্শকদের দেখানো হবে, যা মুহূর্তের মধ্যেই সব বিতর্কের অবসান ঘটাবে।
মাঠের ভুল সিদ্ধান্ত এবং একতরফা বিতর্ক কমাতে ফিফা আরেকটি দারুণ ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এনেছে, যার নাম ‘ফুটবল ভিডিও সাপোর্ট’ বা এফভিএস। এটি প্রথাগত ভিএআর থেকে কিছুটা আলাদা। বড় সুবিধা হলো, এটি কোচদের সরাসরি ক্ষমতা দেয়। প্রতি ম্যাচে দুই দলের প্রধান কোচরা মাঠের রেফারির যেকোনো বড় সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ বা রিভিউ করার সুযোগ পাবেন। যদি ভিডিওতে দেখা যায় কোচের দাবি সঠিক ছিল, তবে তারা পরে আবার রিভিউ করার সুযোগ পাবেন; দাবি ভুল হলে সে সুযোগ বাতিল হয়ে যাবে। এ নিয়মের ফলে রেফারি ও দলগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা বজায় থাকবে।
মাঠের খেলার পাশাপাশি বাইরের
আবহাওয়া সামলানোর প্রযুক্তিও এবার দারুণ চমকপ্রদ। মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের গ্রীষ্মকালীন
প্রচণ্ড গরম ও অস্বস্তিকর আর্দ্রতা থেকে বাঁচতে স্টেডিয়ামগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে
‘স্মার্ট মাইক্রো ক্লাইমেট কন্ট্রোল’ প্রযুক্তি। এটি মূলত কাতার বিশ্বকাপের কুলিং সিস্টেমেরই
আরও পরিবেশবান্ধব একটি রূপ। স্টেডিয়ামের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা এআই সেন্সরগুলো গ্যালারির
দর্শক সংখ্যা এবং মাঠের তাপমাত্রা মেপে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসনের নিচ থেকে ঠান্ডা বাতাস
ছাড়বে, যা খেলোয়াড় ও দর্শকদের
দেবে স্বস্তি।
এদিকে গ্যালারিতে বসে যারা খেলা দেখবেন, তাদের অভিজ্ঞতাকে আরও জাদুকরী করতে ‘ফিফা প্লাস’ অ্যাপে যুক্ত করা হয়েছে ‘অগমেন্টেড রিয়ালিটি’ বা এআর ফিচার। একজন দর্শক যখন গ্যালারি থেকে মাঠের দিকে ফোনের ক্যামেরা ধরবেন, তখন স্ক্রিনে ঘটবে আশ্চর্য এক কাণ্ড। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের মাথার ওপর তাদের নাম, কে কত গতিতে দৌড়াচ্ছেন, কার পাস কতটা নিখুঁত— এমন সব লাইভ পরিসংখ্যান চোখের সামনে ভেসে উঠবে।





