বিবর্তনের ছায়া কি বাধা দিচ্ছে সুস্থ বার্ধক্যে

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
আজকাল চারপাশে তাকালেই দেখা যায়, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি বছর বেঁচে থাকছে। আমাদের দাদা-দাদি বা নানা-নানিরা বেশ দীর্ঘ আয়ু পাচ্ছেন। কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের শরীর নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
অর্থাৎ, বেঁচে থাকার বছরগুলো সবসময় সুস্থভাবে কাটছে না। বয়স বাড়লেই কেন শরীর এমন ভেঙে পড়বে? এটা কি একেবারেই অনিবার্য? এই জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হান্দান মেলিক দোনের্তাশ এবং লিন্ডা পারট্রিজ নামের দুজন বিজ্ঞানী মানুষের জিন বা বংশগতির এক বিশাল তথ্যভাণ্ডার নিয়ে গবেষণা করেছেন।
তারা বিজ্ঞানীদের বহু পুরনো একটা তত্ত্ব বা আইডিয়া পরীক্ষা করে দেখেছেন, যার নাম ‘সিলেকশন শ্যাডো’ বা ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছায়া’। তাদের এই চমৎকার গবেষণাটি বিজ্ঞান জগতের বিখ্যাত ‘ন্যাচার রিভিউস জেনেটিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
চার্লস ডারউইনের ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ বা ‘যোগ্যতমের জয়জয়কার (সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’ তত্ত্বটি বলছে, প্রকৃতিতে সেই জীবই টিকে থাকে এবং বংশবৃদ্ধি করতে পারে, যে সবচেয়ে বেশি ফিট বা উপযুক্ত।
বিবর্তনের মূল লক্ষ্যই হলো একটা প্রজাতি যেন সুস্থ-সবলভাবে বেঁচে থেকে সন্তান জন্ম দিতে পারে এবং তাদের বংশধারা টিকিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষ যখন সন্তান জন্ম দিয়ে দেয়, তারপর সে কতটা সুস্থ থাকল বা তার শরীরে কী রোগ হলো, তা নিয়ে প্রকৃতির আর কোনো মাথা ব্যথা থাকে না।
এখানেই জন্ম নেয় ‘সিলেকশন শ্যাডো’ বা বিবর্তনের ছায়া। তরুণ বয়সে আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে বিবর্তন বা প্রকৃতি যেভাবে কড়া নজর রাখে, বয়স পঞ্চাশ বা ষাট পার হওয়ার পর সেই নজরদারি আর থাকে না।
বিবর্তনের ছায়া, যার নিচে পড়ে আমাদের বার্ধক্যের স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে।
এই ছায়ার কারণে আমাদের শরীরে প্রধানত দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথমত, কিছু ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন আছে যেগুলো কেবল বৃদ্ধ বয়সেই মানুষের শরীরে রোগ তৈরি করে। যেহেতু তরুণ বয়সে এগুলো কোনো ক্ষতি করে না এবং মানুষ সুস্থভাবেই সন্তান জন্ম দিয়ে দেয়, তাই প্রকৃতি এই খারাপ জিনগুলোকে মানবজাতি থেকে তাড়ানোর কোনো সুযোগ পায় না।
ফলে এগুলো আমাদের শরীরে যুগের পর যুগ ধরে জমা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের শরীরে এমন কিছু জিন আছে যেগুলো দুই রকম আচরণ করে। যেমন, একটি জিন হয়তো তোমার ২০ বা ৩০ বছর বয়সে শরীরকে দারুণ শক্তিশালী রাখছে এবং বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করছে, কিন্তু ওই একই জিন তোমার ৬০ বছর বয়সের পর শরীরে ক্যান্সার বা অন্য কোনো জটিল রোগ তৈরি করছে।
বিবর্তনের কাছে যেহেতু তরুণ বয়সের সুস্থতা বেশি জরুরি, তাই প্রকৃতি এই জিনটিকে আমাদের শরীরে টিকিয়ে রাখে। বৃদ্ধ বয়সের ক্ষতিটাকে বিবর্তন একপ্রকার মেনে নেয়।
বিজ্ঞানীরা লাখ লাখ মানুষের তথ্য যাচাই করে দেখেছেন যে, এই ‘সিলেকশন শ্যাডো’র ধারণাটি একদম সত্যি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের শরীরে যে নানা রকম প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি হয় এবং কোষগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, তার পেছনে এই জিনগুলোই দায়ী।
তবে বিজ্ঞানীরা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা ‘মোল র্যাট’ নামের এক ধরনের বিশেষ ইঁদুরের জীবন নিয়েও গবেষণা করেছেন, যারা খুব অদ্ভুতভাবে অনেক বেশি বছর বাঁচে এবং বৃদ্ধ বয়সেও সুস্থ থাকে।
বিজ্ঞানীরা দেখছেন, এই প্রাণীরা কীভাবে প্রকৃতির এই নিয়মকে ফাঁকি দিয়ে বুড়ো বয়সেও নিজেদের ফিট রাখছে। তাদের এই জৈবিক কৌশলগুলো যদি আমরা বুঝতে পারি, তবে মানুষের বার্ধক্যকেও রোগমুক্ত করা সম্ভব।
তাহলে এই গবেষণার আসল লাভ কী? বিজ্ঞানী লিন্ডা পারট্রিজ বলেছেন, আমাদের উদ্দেশ্য শুধু মানুষের বেঁচে থাকার বয়স বা আয়ু বাড়ানো নয়, বরং জীবনের শেষ সময়টুকু যেন মানুষ সুস্থ ও রোগমুক্তভাবে কাটাতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা।
আমরা বুড়ো হই কারণ আমাদের শরীরের কোষগুলো একসময় কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যদি এই ক্ষতিকর জিনগুলোর মূল কারণ খুঁজে বের করে ওষুধ তৈরি করতে পারেন, তবে বৃদ্ধ বয়সের রোগ বা কষ্ট অনেক কমিয়ে আনা যাবে।
সহজ কথায়, এই আবিষ্কারের ফলে ভবিষ্যতে মানুষ হয়তো অনেক বছর বাঁচবে।




