আর্টেমিস টু: ১০ দিনের চন্দ্রযাত্রায় কী কী ঘটবে?

কেনেডি স্পেস সেন্টারে এসএলএস রকেটের উৎক্ষেপণ দেখতে জড়ো হন অনেকে। ছবি: গ্যাটে ইমেজ
অবশেষে শুরু হলো বহু প্রতীক্ষিত নাসার আর্টেমিস টু মিশন। স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে, যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বিশাল এসএলএস রকেটটি আকাশ কাঁপিয়ে উঠে গেল। সেই রকেটে চড়ে ওরিয়ন মহাকাশযানে চড়ে চাঁদের পথে রওনা হলেন চার মহাকাশচারী- কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ এবং জেরেমি হ্যানসেন।
এটি কোনো অবতরণ মিশন নয়, এটা মানুষের গভীর মহাকাশ অভিযানের ভবিষ্যতকে পরীক্ষা করার সবচেয়ে বড় টেস্ট ফ্লাইট। প্রায় ১০ দিনের যাত্রা, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ভবিষ্যতের চাঁদ অভিযান, আর শেষ পর্যন্ত মঙ্গলগ্রহ পর্যন্ত মানুষের যাত্রার ভিত্তি তৈরি করবে।
মিশনের পথ—ফ্রি রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি
প্রায় ১১ লাখ কিলোমিটার দীর্ঘ এই যাত্রায় ওরিয়ন যাবে একটি ফিগার–৮ আকৃতির পথে। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে এমনভাবে ঘুরে আসবে যে কোনো সমস্যা হলেও মহাকাশযান নিজে থেকেই পৃথিবীতে ফিরে আসবে। জ্বালানিও বাঁচবে, নিরাপত্তাও বাড়বে।
সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে ওরিয়ন থাকবে চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৪,০০০–৬,০০০ মাইল দূরে। আর ফার সাইড ঘুরে পৃথিবী থেকে মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে দূরবর্তী অবস্থানের নতুন রেকর্ড হবে, অ্যাপোলো ১৩-এর রেকর্ড ভেঙে।
১০ দিনের অভিযানের বৃত্তান্ত
রকেট উৎক্ষেপণের কিছুক্ষণ পরই ওরিয়ন আলাদা হয় আইসিপিএস থেকে এবং পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করে।
প্রথম দিন মহাকাশযানের ভেতরে শুরু হয় একটানা সিস্টেম চেক। লাইফ সাপোর্ট (বাতাস, তাপমাত্রা, পানি, টয়লেট), যোগাযোগ, নেভিগেশন—সবকিছুর পরীক্ষা।
নভোচারীরা আসন ছেড়ে কেবিনকে উৎক্ষেপণ–মোড থেকে সাধারণ স্পেসফ্লাইট মোডে নিয়ে যান। একই সময়ে আইসিপিএসকে কেন্দ্র করে কাছাকাছি ম্যানুভার করে দেখা হয় দুটো যান কতটা স্থিরভাবে একে অন্যের সঙ্গে কাজ করতে পারে। প্রথম দিনের মধ্যেই তারা কক্ষপথে প্রথম খাবার খান ও কিছু বিশ্রাম নেন।
দ্বিতীয় দিনে পৃথিবীর কক্ষপথেই আরও গভীরভাবে পরীক্ষা হবে ওরিয়নের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমের। স্থাপন করা হবে ফ্লাইহুইল এক্সারসাইজ ডিভাইস যা দিয়ে নভোচারীরা ব্যায়াম করবেন এবং এর ফলে কেবিনের বাতাসের ভারসাম্য, আর্দ্রতা, কার্বন ডাইঅক্সাইড নিয়ন্ত্রণ সবই পর্যবেক্ষণ করা হবে। এদিনই শুরু হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি টিএলআই বার্ন। যা ওরিয়নকে পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে চাঁদের দিকে ঠেলে দেবে। এই বিশাল ম্যানুভার সম্পন্ন হবে ইউরোপিয়ান সার্ভিস মডিউলের শক্তিশালী ইঞ্জিন দিয়ে।
তৃতীয় থেকে পঞ্চম দিন
এ সময়টা মূলত চাঁদের দিকে চার দিনের একটানা ভ্রমণ। মহাকাশচারীরা পরীক্ষা চালিয়ে যাবেন ওরিয়নের সব সিস্টেম। প্রপালশন, নেভিগেশন, রেডিয়েশন সুরক্ষা। জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তার অনুশীলনও হবে প্রতিদিন। চাঁদের মহাকর্ষীয় বলয়ে প্রবেশের জন্য তারা মানসিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নেবেন। প্রত্যেকের মেডিকেল চেকআপ হবে, কেবিনের ভেতরের পরিবেশ—কার্বন ডাইঅক্সাইড, তাপমাত্রা—সবই নজরে রাখা হবে।
এরপর আসে এই মিশনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিন, ফ্লাইট ডে ৬, চাঁদের একেবারে কাছ দিয়ে ফ্লাইবাই। ওরিয়ন পৌঁছে যাবে চাঁদের ফার সাইডে। পৃথিবী থেকে কখনোই দেখা যায় না যে অন্ধকার দিক, সেই জায়গা দিয়ে ধীরে ধীরে ভেসে যাবে মহাকাশযান। নভোচারীরা তোলবেন চাঁদের সবচেয়ে কাছের ও পরিষ্কার ছবি, ভিডিও এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ। এবং ঠিক এখানেই ঘটবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—স্লিংশট ম্যানুভার।
চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ ব্যবহার করে ওরিয়ন নতুন গতি পাবে এবং পৃথিবীর দিকে ফিরে আসবে। চাঁদের এই নীরব, গভীর অংশ থেকে তারা ভেসে যখন দূরে সরে যাবেন, তখনও সিস্টেম চেক আর ডেটা সংগ্রহ চলতেই থাকবে।
এরপর ৭ থেকে ৯ দিন
পৃথিবীর পথে ফিরে আসার সময়। হিট শিল্ড পরীক্ষা হবে, যেটাই পৃথিবীতে ফেরার সময় সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা–বর্ম। নেভিগেশন, যোগাযোগ, সব সিস্টেম আরেকবার যাচাই করা হবে। মহাকাশচারীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর নজর রাখা হবে। দীর্ঘ মহাকাশযাত্রায় শরীর কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছে তা দেখা হবে। ভবিষ্যৎ আর্টেমিস মিশনের জন্য জরুরি ডেটা সংগ্রহ করা হবে।
দশম দিনে চূড়ান্ত মুহূর্ত
ওরিয়ন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়বে ঘণ্টায় প্রায় ২৫,০০০ মাইল (প্রায় ৪০,০০০ কিলোমিটার/ঘণ্টা) গতিতে। গরম প্লাজমার দেয়ালের ভেতর দিয়ে ওরিয়ন যখন নিচে নেমে আসবে, তখন পরীক্ষা হবে হিট শিল্ডের আসল ক্ষমতা। সব ঠিক থাকলে মহাকাশযান ধীরে ধীরে প্যারাশুট খুলে প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে আসবে—স্প্ল্যাশডাউন। সান ডিয়েগো উপকূলে অপেক্ষায় থাকবে উদ্ধারকারী দল। যারা দ্রুত চার মহাকাশচারীকে নিরাপদে তুলে আনবেন।
এই যাত্রায় যা পরীক্ষা হচ্ছে
ওরিয়নের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, প্রপালশন, নেভিগেশন, হিট শিল্ড, রেডিয়েশন সুরক্ষা, জরুরি প্রোটোকল ও ম্যানুয়াল পাইলটিং।
এসবের প্রতিটিই ভবিষ্যতে মানুষের চাঁদে অবতরণকে নিরাপদ করবে। আর যদি এই মিশন সফল হয়, শুরু হবে আর্টেমিস থ্রি, যেখানে প্রথমবারের মতো মানুষ যাবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে, সম্ভবত ২০২৮ সালের দিকে।
তারপর? চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি আর সেখান থেকেই মঙ্গলগ্রহে মানুষের যাত্রা।
সূত্র: নাসা

