মানবাকৃতি রোবট বিপ্লবে বদলে যাচ্ছে জীবন

সায়েন্স ফিকশন সিনেমা ‘টার্মিনেটর’-এর পর্দা ছেড়ে মানবাকৃতির রোবট এখন সময়ের স্রোতে মানুষের সহযাত্রী হচ্ছে। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
বিজ্ঞান কল্পকাহিনির রুপালি পর্দা থেকে বাস্তব পৃথিবীতে পা রেখেছে মানবাকৃতির বা হিউম্যানয়েড রোবট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অভাবনীয় বিপ্লব এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মেলবন্ধনে আজ রোবটগুলো কেবল পূর্বনির্ধারিত কিছু কোড মেনে চলা জড়বস্তু নয়; তারা চারপাশের পরিবেশকে বুঝতে পারছে, সিদ্ধান্ত নিতে পারছে এবং মানুষের মতোই জটিল সব শারীরিক কাজ নিখুঁতভাবে করছে।
প্রযুক্তির বৈশ্বিক বাজারে চোখ রাখলে দেখা যায়, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় টেক জায়ান্ট এবং স্টার্টআপ কোম্পানিগুলো এখন মানবাকৃতির রোবট তৈরির এক অলিখিত প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। এই দৌড়ে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান টেসলার ‘অপটিমাস’।
এর সর্বশেষ সংস্করণে ব্যবহৃত হয়েছে টেসলা গাড়ির স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং প্রযুক্তি এবং অত্যাধুনিক নিউরাল নেটওয়ার্ক, যা রোবটটিকে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তায় কোনো বস্তুকে চিনতে, মানুষের চোখের পলকে সিদ্ধান্ত নিতে এবং নিখুঁতভাবে মানুষের কাজ নকল করতে সাহায্য করে। ঠিক একইভাবে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে রোবটিকস জগতের অন্যতম শীর্ষ চীনা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রি। তাদের তৈরি ‘ইউনিট্রি জি১’ ও ‘এইচ১’ হিউম্যানয়েড রোবটগুলো গতির দিক থেকে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে।
বিশেষ করে জি১ মডেলটি তার অবিশ্বাস্য নমনীয়তা, লাফিয়ে ডিগবাজি খাওয়ার ক্ষমতা এবং মাত্র ১৬ হাজার ডলারের মতো সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে এই প্রযুক্তিকে সাধারণের হাতের নাগালে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে।
চীনের বেশ কয়েকটি শহরে এরই মধ্যে ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকায় দেখা গেছে রোবট। সাধারণ মানুষও বেশ কৌতূহলী
শুধু টেসলা বা ইউনিট্রি নয়; রোবটিকসের দুনিয়ায় দীর্ঘদিনের চেনা নাম বোস্টন ডায়নামিকসের তৈরি ‘অ্যাটলাস’ রোবটটি তার হাইড্রোলিক সিস্টেম ছেড়ে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক সংস্করণে রূপ নিয়েছে। এতে এর নমনীয়তা ও কর্মক্ষমতা আগের চেয়ে বহু গুণ বেড়েছে। এ ছাড়া ফিগার এআই, অ্যাজিলিটি রোবটিকস ও সলচুয়ান ইউনিভার্সিটির গবেষকদের তৈরি রোবটগুলো এরই মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন বড় কারখানায় পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করে দিয়েছে। যা প্রমাণ করে, এই প্রযুক্তি আর ল্যাবরেটরির চার দেয়ালে বন্দি নেই।
হিউম্যানয়েড রোবটের এই আকস্মিক ও শক্তিশালী উত্থানের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে জেনারেটিভ এআই ও লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের বিশাল অগ্রগতি। বর্তমানের রোবটগুলো মাল্টিমোডাল এআই মডেলের সহায়তায় মানুষের মুখের কথা শুনে বা মানুষের কাজের ভিডিও দেখেই সেই কাজ নিজে নিজে শিখে নিতে পারছে।
ধরুন, একটি রোবটকে যদি বলা হয় টেবিল থেকে কফির কাপটি তুলে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে, সে তার ভিজ্যুয়াল সেন্সর বা ক্যামেরার মাধ্যমে কাপের দূরত্ব ও গভীরতা পরিমাপ করে এবং হাতের কৃত্রিম আঙুলগুলোর স্পর্শানুভূতি বা ট্যাকটাইল সেন্সরের সাহায্যে ঠিক ততটুকুই চাপ প্রয়োগ করে, যতটুকু কাপটি ভাঙা বা ফেলে না দিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন।
এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব যে কেবল সুবিধার জোয়ার আনছে তা নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন
মানুষের বুদ্ধিমত্তা যেভাবে কাজ করে, ঠিক সেই ধাঁচেই রোবটের এই লার্নিং প্রসেস বা শেখার প্রক্রিয়া কাজ করছে, যা প্রযুক্তিবিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। শিল্পকারখানা ও লজিস্টিকস খাতে মানবাকৃতির রোবটের ব্যবহার এরই মধ্যে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বিশ্বের বড় বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও অ্যামাজনের মতো রিটেইল জায়ান্টদের গুদামে এই রোবটগুলো ভারী বাক্স স্থানান্তর, মালপত্র বাছাই এবং প্যাকেজিংয়ের মতো একঘেয়ে ও কঠোর পরিশ্রমের কাজগুলো অনায়াসে করছে।
যেহেতু এই রোবটগুলো দেখতে মানুষের মতো, তাই কারখানার প্রচলিত অবকাঠামোতে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন না করেই এদের কাজে লাগিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। মানুষের জন্য তৈরি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা, সরু গলি দিয়ে হেঁটে যাওয়া বা ভারী জিনিস বহন করার মতো কাজ হিউম্যানয়েড রোবটগুলো কোনো ক্লান্তি বা বিরতি ছাড়াই চব্বিশ ঘণ্টা করতে পারে।
ফলে উৎপাদনশীলতা যেমন বহু গুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে মানুষের জীবনহানির আশঙ্কাও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে। শ্রমবাজারের বাইরে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও এই রোবটগুলো খুব দ্রুত জায়গা করে নিতে চলেছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যেখানে বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে এবং তীব্র স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর সংকট দেখা দিচ্ছে, সেখানে হিউম্যানয়েড রোবট একটি চমৎকার সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
চিকিৎসাক্ষেত্রে জটিল অস্ত্রোপচারে সার্জনদের সহায়তা করা, দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালানো কিংবা খনি ও পারমাণবিক কেন্দ্রের মতো চরম প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের বিকল্প হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে এ রোবটগুলোর কোনো বিকল্প নেই।
তবে এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব যে কেবল সুবিধার জোয়ার আনছে তা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় যে আশঙ্কার কথা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তা হলো বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানচ্যুতি। যদি কারখানার উৎপাদন, বিপণন ও সেবামূলক কাজ রোবট একাই করে ফেলে, তবে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাদের জীবিকা হারাবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে।
যদিও আশাবাদীদের মতে, এই প্রযুক্তির ফলে পুরনো ধাঁচের কিছু চাকরি হারিয়ে গেলেও তথ্যপ্রযুক্তি, রোবট রক্ষণাবেক্ষণ এবং ডেটা অ্যানালিটিকসের মতো ক্ষেত্রে লাখ লাখ নতুন ও উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া রোবটের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় নৈতিকতার প্রশ্ন এবং নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা সাইবার আক্রমণের শিকার হলে এই শক্তিশালী রোবটগুলো মানুষের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে মানবাকৃতির রোবট এখন আর দূর ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন নয়; বরং আমাদের বর্তমান বাস্তবতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রযুক্তির গতি যেভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তাতে আগামী এক দশকের মধ্যে আমাদের ঘরের ভেতরে কিংবা রাস্তার মোড়ে একটি হিউম্যানয়েড রোবটের দেখা পাওয়াটা মোবাইল ফোনের মতো স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এই প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও গতিশীল করে তুলবে, সন্দেহ নেই। তবে এর সফল ও কল্যাণকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সঠিক বৈশ্বিক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ। মানুষ ও যন্ত্রের এই যুগলবন্দি যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তবে তা মানব সভ্যতাকে সমৃদ্ধির এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যাবে, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের প্রতিযোগী নয়; বরং পরম সহযোগী হিসেবে বিশ্বকে বদলে দেবে।





