রোমান কাচের রহস্য উন্মোচন

প্রাচীন রোমানদের কাচ তৈরির দক্ষতা আজও বিস্ময় জাগায়। তাদের তৈরি অসংখ্য শিল্পকর্মের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রায় ১ হাজার ৬০০ বছরের পুরনো একটি পাত্র, যার নাম ‘লাইকার্গাস কাপ’। লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত এই পাত্রের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো, আলোর অবস্থান বদলালে এর রঙও বদলে যায়। স্বাভাবিক আলোয় এটি জেড পাথরের মতো সবুজ দেখায় আর পাত্রের পেছন থেকে আলো ফেললে হয়ে ওঠে রুবির মতো লাল। প্রাচীনকালের কারিগররা কীভাবে এমন অসাধারণ কাচ তৈরি করেছিলেন, তা দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদ ও কাচশিল্পীদের কৌতূহলের বিষয়।
এবার যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডের বিজ্ঞানীরা প্রাচীন এই পাত্রের রঙ পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্য পুনরায় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। মূল রোমান পাত্রের একটি খণ্ড থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রাচীন কাচ তৈরির পদ্ধতি অনুসরণ করে তারা এমন কাচ তৈরি করেছেন, যা প্রায় একইভাবে আলোর সঙ্গে রঙ বদলায়। গবেষকদের এই সাফল্য শুধু প্রাচীন রোমানদের কারিগরি দক্ষতা বুঝতে সাহায্য করবে না; বরং আধুনিক বিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক শিল্পকলার মধ্যে নতুন সংযোগও তৈরি করবে।
শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিক, উপকরণ ও জৈবিক প্রকৌশল বিভাগের কারিগরি বিশেষজ্ঞ ড. লিসা হল্যান্ডস এই গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার ভাষায়, কাজটি ছিল ভালোবাসা ও ধৈর্যের পরীক্ষা। এর আগে অন্যরাও একই ধরনের কাচ তৈরির চেষ্টা করেছেন; কিন্তু সফলতা ছিল সীমিত। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত রঙ তৈরি করতে পেরে তিনি একে প্রায় জাদুর মতো অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করেছেন। গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি কাজ করেন রোমান কাচ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ক্যারোলিন জ্যাকসনের সঙ্গে।
গবেষণায় দেখা যায়, পাত্রটির রঙ পরিবর্তনের রহস্য লুকিয়ে রয়েছে কাচের ভেতরে মেশানো অতিক্ষুদ্র সোনা ও রুপার কণায়। এগুলোকে বলা হয় ন্যানোকণা। বালুকণার চেয়েও হাজার গুণ ক্ষুদ্র এসব কণার আকার এতটাই ছোট, যা খালি চোখে আলাদাভাবে দেখা যায় না। শেফিল্ডের গবেষকরা গলিত কাচের মধ্যে সোনা ও রুপার ন্যানোকণা তৈরি করার প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন। এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় কাচ গলানোর পর সেটি ধীরে ধীরে ঠান্ডা করা হয়। এ সময় কাচের ভেতরের উপাদানগুলোর চারপাশে সোনা ও রুপার ক্ষুদ্র স্ফটিক বেরিয়ে আসতে থাকে। এসব ন্যানোকণাই কাচের বিশেষ আলোকীয় বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী।
গবেষক হল্যান্ডস ব্যাখ্যা করেন, সাদা আলো আসলে বিভিন্ন রঙের আলোর সমষ্টি। ন্যানোকণার আকার আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তুলনায় অনেক ছোট হওয়ায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এগুলো আলোর কিছু রঙ শোষণ বা আটকে দিতে পারে। লাইকার্গাস কাপের মতো কাচের মধ্য দিয়ে আলো প্রবেশ করলে সোনা ও রুপার কণাগুলো নীল ও সবুজ আলোর বড় অংশ আটকে দেয়। ফলে লাল ও কমলা রঙের আলো বেশি দৃশ্যমান হয়। অন্যদিকে, কাচের পৃষ্ঠে আলো প্রতিফলিত হলে ন্যানোকণাগুলো আলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেয়। এতে পাত্রটি সবুজ দেখায়, অর্থাৎ একই কাচের রঙ আলোর প্রবেশ ও প্রতিফলনের পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে যায়।



