সার্জারিতে রোবট

পুরো প্রক্রিয়াটি মাইলের পর মাইল দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছেন একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
অপারেশন থিয়েটারের তীব্র আলোয় শায়িত রোগী। তবে তার চারপাশে কোনো সার্জন বা নার্স নেই। নিখুঁতভাবে স্ক্যালপেল ও ফরসেপস নাড়াচাড়া করে পিত্তথলি কেটে বাদ দিচ্ছে পাঁচ ফুট উচ্চতার এক হিউম্যানয়েড বা মানবসদৃশ রোবট, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সার্জি’। আর এ পুরো প্রক্রিয়াটি মাইলের পর মাইল দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছেন একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন অবিশ্বাস্য ঘটনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান ডিয়েগোর একদল গবেষক ও চিকিৎসক। অ-প্রাইমেট স্তন্যপায়ী প্রাণীর ওপর চালানো এই প্রাক-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সফলভাবে দুটি পিত্তথলি অপসারণ করা হয়েছে। যার একটি সম্পন্ন করেছে একটি রোবট ও একজন মানব সহকারী এবং অন্যটি সম্পন্ন করেছে এক জোড়া রোবট।
রোবট-সহায়তায় অস্ত্রোপচার চিকিৎসা বিশ্বে নতুন নয়। তবে প্রচলিত ডাব্লিউ-আকৃতির বিশালকার সার্জিক্যাল সিস্টেমগুলোর ওজন প্রায় ১ হাজার ৮০০ পাউন্ডের বেশি হয়। এগুলো ইনস্টল করতে যেমন বিশেষায়িত অপারেশন থিয়েটার লাগে, তেমনি এগুলো সাধারণত এক ধরনের নির্দিষ্ট অস্ত্রোপচারের জন্যই তৈরি। ঠিক এ জায়গায়ই বিপ্লব ঘটিয়েছে ‘সার্জি’। মাত্র ৬০ পাউন্ড ওজনের এ রোবটগুলো অত্যন্ত চটপটে, ছোট এবং বর্তমান মেডিকেল রোবটগুলোর তুলনায় অনেকগুণ সাশ্রয়ী।
গবেষক দলের অন্যতম প্রকৌশলী মাইকেল ইপ জানান, দূরবর্তী স্থান থেকে নিয়ন্ত্রিত এই হিউম্যানয়েড রোবটগুলো বিশ্বের চিকিৎসাবঞ্চিত অঞ্চলের মানুষদের জটিল অস্ত্রোপচারের সুবিধা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। চিকিৎসকদের জন্য রোবটের হাতগুলো দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করাও ছিল বেশ সহজ ও প্রাকৃতিক।
সহ-গবেষক সার্জন শ্যাংলেই লিউয়ের মতে, এ রোবটগুলোর আকার ছোট এবং খরচ কম হওয়ায় এগুলোকে গ্রামীণ এলাকা, যুদ্ধক্ষেত্র এমনকি মহাকাশেও সহজে মোতায়েন করা সম্ভব। তবে এই ঐতিহাসিক সফলতার পাশাপাশি কিছু প্রাথমিক চ্যালেঞ্জও দেখা গেছে। প্রচলিত ব্যবস্থার চেয়ে ‘সার্জি’র ক্ষেত্রে কয়েকবার রিক্যালিব্রেশন করতে হয়েছে, যা অস্ত্রোপচারের গতি কিছুটা কমিয়ে দেয়।
এ ছাড়া রিমোট কন্ট্রোলার এবং রোবটের মধ্যকার সিগন্যাল আদান-প্রদানের সময় বা ল্যাটেন্সি আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। অবশ্য গবেষকরা আশাবাদী। তারা মনে করিয়ে দেন, প্রথম ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারিতে যেখানে ছয় ঘণ্টা লেগেছিল, আজ প্রযুক্তির কল্যাণে তা মাত্র ৩০ মিনিটে সম্ভব হচ্ছে।
ভবিষ্যতে ‘সার্জি’ শুধু নিজেই অপারেশন করবে না, অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসকদের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এগিয়ে দেওয়া বা অস্ত্রোপচার শেষে ঘর পরিষ্কারের কাজও করতে পারবে। গবেষকদের মূল লক্ষ্য এমন এক ভবিষ্যতের অপারেশন থিয়েটার গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ এবং হিউম্যানয়েড রোবট কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি সমন্বিত দল হিসেবে কাজ করবে এবং দূর করবে বিশ্বের স্বাস্থ্যসেবার সংকট।




