সাগরতলের খনিজই ভরসা!

জীবাশ্ম জ্বালানির যুগ শেষ হতে চলেছে। রোবটিকস কম্পিউটার ও ব্যাটারির যুগে এখন দরকার বিরল খনিজ। গভীর সমুদ্র হয়ে উঠতে পারে এসবের বড় উৎস। লিখেছেন ইমরানুর রহমানইমরানুর রহমান
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন কিংবা মহাশূন্যের কোনো কক্ষপথ থেকে আমাদের এই পৃথিবীর দিকে তাকালে নীল রঙের এক অবিশ্বাস্য বিশালতা চোখ জুড়িয়ে দেয়। এই বিশাল জলরাশির অতল গহ্বরে লুকিয়ে রয়েছে মানবসভ্যতার সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যৎ রূপান্তরের এক অভাবনীয় ও রহস্যময় খনিজ ভাণ্ডার, যা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই।
স্থলভাগের মাটি খুঁড়ে খনিজ উত্তোলনের প্রচলিত দিনগুলো ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে। কারণ, সভ্যতার দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে উচ্চ প্রযুক্তির নিত্যনতুন উপকরণ, যেমন— বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, স্মার্টফোন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির টারবাইন তৈরির জন্য আজ যে পরিমাণ খনিজের প্রয়োজন, তা মেটানোর রসদ ডাঙার খনিগুলোতে ধীরে ধীরে কমে আসছে। ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি গিয়ে পড়েছে পৃথিবীর এমন এক রহস্যময় ঠিকানায়, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। গভীর সমুদ্রের সেই চির অন্ধকার অতল তলে শুরু হতে যাচ্ছে এক নতুন খনিজ উন্মাদনা, যার পোশাকি নাম ডিপ সি মিনারেল মাইনিং বা গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে খনিজ উত্তোলন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার মিটার নিচে, যেখানে পানির প্রচণ্ড চাপ এবং ঘুটঘুটে অন্ধকারের রাজত্ব, সেখানে লুকিয়ে রয়েছে কোটি কোটি টন মূল্যবান ধাতুর এক বিশাল সম্ভার। বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সমুদ্রের তলদেশ প্রধানত তিন ধরনের খনিজসম্পদে প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ। এর মধ্যে প্রথমটি হলো ম্যাঙ্গানিজ নোডিউলস, যা দেখতে অনেকটা ছোট আলুর মতো কিংবা গোল গোল পাথরের পিণ্ডের মতো হয়। এটি সমুদ্রের পলিময় বিস্তীর্ণ সমভূমিতে অবারিতভাবে ছড়িয়ে থাকে। ম্যাঙ্গানিজ ও লোহা ছাড়াও সেখানে নিকেল, তামা ও কোবাল্টের মতো খুবই মূল্যবান ও দুর্লভ উপাদান উচ্চমাত্রায় থাকে।
দ্বিতীয় ধরনের খনিজসম্পদ হলো সিভাস বা সমুদ্রের তলদেশের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা উষ্ণ প্রস্রবণগুলোর চারপাশে জমে ওঠা সালফাইডসমৃদ্ধ আস্তরণ। সমুদ্রের তলদেশের আগ্নেয়গিরি বা ভূগর্ভে ফাটল থেকে বের হওয়া উত্তপ্ত ও খনিজসমৃদ্ধ পানি যখন ঠান্ডা সমুদ্রের পানির সংস্পর্শে আসে, তখন সেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই কঠিন খনিজগুলো জমা হতে থাকে। এ ধরনের উষ্ণ প্রস্রবণগুলোর চারপাশে সোনা, রুপা, তামা ও জিংকের মতো ধাতুর এক বিশাল মজুদ লুকিয়ে থাকে, যা আধুনিক প্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়।
তৃতীয় ধরনের খনিজ হলো কোবাল্টসমৃদ্ধ ক্রাস্ট, যা সমুদ্রের তলদেশের বিভিন্ন ডুবো পাহাড় বা সি-মাউন্টের খাড়া গায়ে কঠিন আস্তরণ বা প্রলেপের মতো জমে থাকে এবং কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় এগুলো ঘন ও টেক্সচারযুক্ত হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উৎকর্ষের ফলে বর্তমান যুগের গবেষক ও প্রকৌশলীরা গভীর সমুদ্রে এই খনিজ আহরণের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো জয় করার জন্য নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান বিশ্ব ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েল থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে এসে সবুজ শক্তির দিকে পা বাড়াচ্ছে এবং সোলার প্যানেল, উইন্ড মিল ও ইলেকট্রিক ভেহিক্যালের জন্য যে রিচার্জেবল ব্যাটারি অপরিহার্য, তার মূল কাঁচামাল হলো নিকেল, কোবাল্ট ও লিথিয়াম।
স্থলভাগের খনিগুলো থেকে এই উপাদানগুলো আহরণ করতে গেলে যেখানে মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয় ও নানা জটিলতা তৈরি হয়, সেখানে সমুদ্রের তলদেশের খনিজগুলো খুবই বিশুদ্ধ এবং এদের খনিজ গ্রেড স্থলভাগের যেকোনো আকরিকের তুলনায় অনেক বেশি। বহু কোটি বছর ধরে সমুদ্রের তলদেশের পলিতে ধীরে ধীরে জমা হওয়া এই খনিজগুলো যদি সঠিকভাবে বিজ্ঞানসম্মত ও পরিমিত উপায়ে আহরণ করা যায়, তবে তা ভবিষ্যতের সবুজ প্রযুক্তির কাঁচামালের চাহিদা পূরণে এক অনন্য বিপ্লব ঘটাতে পারে।
তবে ডিপ সি মিনারেল মাইনিং বা গভীর সমুদ্রের এই খনিজ আহরণ প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক দিকটি যতটা রোমাঞ্চকর, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ এবং বিপদগুলো ঠিক ততটাই ভীতিপ্রদ ও জটিল। যে গভীরতায় এই মাইনিং বা খননকার্য চালানো হয়, সেখানকার বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম আমাদের পরিচিত ভূপৃষ্ঠের বায়ুমণ্ডলীয় পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং সংবেদনশীল। কোটি কোটি বছর ধরে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ও চরম উচ্চ চাপে গড়ে ওঠা এই অদ্ভুত পরিবেশ সম্পর্কে মানবজাতির বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এখনো সীমিত। পরিবেশবাদী গবেষকদের মতে, সমুদ্রের তলদেশে এই ভারী ও দৈত্যাকার খনিযন্ত্রগুলো দিয়ে কাটাছেঁড়া বা ড্রিলিং করলে সেখানে যে বিশাল পরিমাণ পলি বা সেডিমেন্ট বা কাদা উথলে উঠবে, তা চারপাশের স্বচ্ছ পানিকে মারাত্মকভাবে ঘোলা করে দেবে।
এই প্লাম্বিং ইফেক্ট বা পলির মেঘ দীর্ঘ দূরত্বে সমুদ্রের পানির স্রোতের টানে ছড়িয়ে পড়ে সমুদ্রের মধ্যস্তরের ফিল্টার ফিডার বা ছাঁকনি জাতীয় সামুদ্রিক প্রাণীগুলোর শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণের পথ বন্ধ করে দিতে পারে এবং তাদের সমগ্র জীবনচক্র চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে। তা ছাড়া সমুদ্রের অতলে চলা এই ভারী খনিযন্ত্রগুলোর বিকট শব্দ, ঘর্ষণ এবং যান্ত্রিক কম্পন গভীর সমুদ্রের তিমি, ডলফিন ও বিভিন্ন প্রজাতির সংবেদনশীল মাছের যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রজনন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
হাইড্রোথার্মাল ভেন্টগুলোর চারপাশে প্রাকৃতিকভাবে বাস করা বিভিন্ন অণুজীব ও ইউনিক সামুদ্রিক প্রাণী, যা আমাদের এই পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ও অজানা তথ্য দিতে পারে, মাইনিং বা খননের ফলে সেই অমূল্য জৈবিক উপাদান চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ারও বড় ঝুঁকি রয়েছে।
গভীর সমুদ্রের এই বিশাল জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষার বিষয়টি আজ বিজ্ঞানীদের কাছে এক সবচেয়ে বড় নৈতিক ও বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, আমরা মহাকাশের বিভিন্ন গ্রহের উপগ্রহ সম্পর্কে যতটা জানি, তার চেয়ে অনেক কম জানি আমাদের এই গ্রহের গভীরতম সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে। সাগরতলের এই চির অন্ধকার জগৎটি কোনো নির্জীব পাথর বা খনিজের স্তূপ মাত্র নয়; বরং এটি আমাদের এই গ্রহের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, কার্বন চক্র পরিচালনা এবং বিশ্বব্যাপী মহাসাগরীয় স্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষার একটি সংবেদনশীল জৈব কারখানা। খনিজ আহরণের ফলে যদি এই অতলস্পর্শী বাস্তুতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যে একবার ছেদ পড়ে, তবে তা পুরো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলকে ভেঙে ফেলতে পারে এবং এর ফলে সামুদ্রিক মাছের প্রজনন থেকে শুরু করে জলবায়ুর ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।







