বিপন্ন বন্যপ্রাণী, কেন তাদের বাঁচাব
বাঘ-হাতির কথা বলি, কিন্তু ভামদের কথা কি মনে আছে?

চট্টগ্রামের জঙ্গলে হগ ব্যাজার। ছবি: সংগৃহীত
বছর কয়েক আগের কথা। শেরপুর পৌর শহরের দিঘারপাড় মহল্লা। একটা বন্যপ্রাণী ধরা পড়ল স্থানীয়দের হাতে। লোকজন এমন অদ্ভুত জন্তু আর দেখেনি। শূকরের মতো নাক, গায়ে লোম, চেহারায় যেন আবার অন্য কোনো বিচিত্র প্রাণীর ছাপ। সৌভাগ্যক্রমে প্রাণীটিকে পিটিয়ে মারা হয়নি। খবর দেওয়া হয়েছিল বন বিভাগকে। পরে জানা গেল, সেটি একটি হগ ব্যাজার।
পাঁচ বছর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে আরেকটি ‘অদ্ভুত’ প্রাণীর ভাগ্যে এতটা সৌভাগ্য জোটেনি। কবরের পাশে ঘোরাঘুরি করছিল বলে তাকে লাশখেকো আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। তারপর গণপিটুনি। পরে ছবিতে দেখা গেল, সেটি ছিল একটি বিন্টুরং বা বাঁশভালুক।
দুটি ঘটনাই আমার মাথায় বারবার ঘুরে ফিরে আসে। কারণ, বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা সাধারণত বাঘ, হাতির কথা বলি। অথচ আমাদের আশপাশের বন, বাঁশঝাড়, ঝোপঝাড় আর গ্রামীণ বনের অজস্র প্রাণীর কথা প্রায় ভুলেই যাই। এমন সব প্রাণী, যাদের অনেককে মানুষ চিনেই না। আর চেনে না বলেই ভয় পায়। ভয় পায় বলেই মেরে ফেলে।
আজ ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে প্রশ্নটা আবারও করা যায়, শুধু মানুষের জন্যই কি এই দেশ?
বাঁশবনের ছায়ায়
বিন্টুরংকে যারা কাছ থেকে দেখেনি, তাদের কাছে প্রাণীটি কিছুটা রহস্যময়ই মনে হবে। কালো লোমে ঢাকা শরীর, গোল কান, বড় চোখ আর অস্বাভাবিক শক্তিশালী একটি লেজ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলে এদের দেখা মেলে।
এদের সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য সম্ভবত লেজ। পৃথিবীর খুব কম স্তন্যপায়ী প্রাণীর এমন লেজ আছে, যা দিয়ে গাছের ডাল শক্ত করে আঁকড়ে ধরা যায়। অনেকটা বানরের হাতের মতো কাজ করে।
ফলমূল, ডুমুর, ছোট প্রাণী, পাখি, ডিম সবই খায়। তবে ডুমুরের প্রতি তাদের বিশেষ দুর্বলতা আছে। আর সেই ডুমুর খেতে খেতেই তারা বনের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বীজ ছড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশে একসময় গ্রামীণ বনেও হয়তো বেশ ভালো সংখ্যায় ছিল বিন্টুরং। এখন তাদের প্রায় সব সাম্প্রতিক রেকর্ডই পার্বত্য চট্টগ্রাম, সাঙ্গু-মাতামুহুরি এলাকা কিংবা অন্যান্য পাহাড়ি বন থেকে আসে। তবু নাসিরনগর, নাটোর কিংবা সুনামগঞ্জের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার দিকে তাকালে মনে হয়, গ্রামীণ বন পুরোপুরি ছেড়ে তারা এখনো যায়নি।
হয়তো কোনো বাঁশবাগানে, হয়তো কোনো পুরোনো বনের ধারে এখনো টিকে আছে কয়েকটি পরিবার।
শহরের ভেতরের বন্যপ্রাণী
হগ ব্যাজারের গল্পটাও কম মজার নয়।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নামই শোনেনি এই প্রাণীর। অথচ দেশের বনাঞ্চলে এখনো অল্পবিস্তর টিকে আছে তারা। বিশেষ করে চট্টগ্রামের বন-পাহাড়ে।
দিনের বেলায় গর্তে বা ঝোপে লুকিয়ে থাকে। রাতে বের হয় খাবারের খোঁজে। ফলমূল, শিকড়, পোকামাকড়, ছোট প্রাণী—সবই খায়।
শেরপুর শহরে ধরা পড়া প্রাণীটি আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। বন্যপ্রাণী মানেই গভীর জঙ্গল নয়।
বাড়ির পেছনের বাঁশঝাড়, গ্রামের পুকুরপাড়, বিলের ধারের ঝোপঝাড় কিংবা শহরতলির ছোট বনও হতে পারে কোনো বন্যপ্রাণীর বাসস্থান।
আমরা প্রায়ই ধরে নিই, যে প্রাণীকে চিনি না, সে নিশ্চয় পথ হারিয়ে এসেছে। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে আমরা-ই তাদের এলাকায় গিয়ে বসতি গড়েছি।
যে প্রাণীগুলো এখনো আমাদের আশপাশে
ঢাকার পূর্বাচল এলাকায় এখনো মেছো বিড়ালের দেখা মেলে।
দেশের বিভিন্ন শহরের প্রান্তে, গ্রামীণ বনে কিংবা জলাভূমির আশপাশে টিকে আছে বনবিড়াল, গন্ধগোকুল, বাঘডাঁস, শিয়াল, উদবিড়াল, মেছো বিড়ালের মতো প্রাণীরা।
রাতে তারা বের হয়। বেশির ভাগ মানুষ জানেই না, তাদের বাড়ির কয়েক শ গজের মধ্যেই হয়তো একটি বন্যপ্রাণী বাস করে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই প্রাণীগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে মানুষের ভুল ধারণার কারণে।
মুরগি খেয়েছে সন্দেহে, ফল নষ্ট করেছে অভিযোগে কিংবা নিছক ভয় পেয়ে তাদের মারা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের জায়গা আমরা নষ্ট করব, তারপর তারা কোথায় যাবে?
বাঘের রাজ্যও আর আগের মতো নেই
বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত বন্যপ্রাণী নিঃসন্দেহে রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
সুন্দরবনের বাঘ এখনো পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঘ জনগোষ্ঠীর অংশ। কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে পরিস্থিতি মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
শিকার, বন ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়—সব মিলিয়ে সুন্দরবনের পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
বাঘ বাঁচাতে হলে শুধু বাঘ নয়, পুরো সুন্দরবনকেই বাঁচাতে হবে। কারণ বাঘ একা বাঁচে না। তার জন্য দরকার হরিণ, বুনো শূকর, বন, জলাভূমি—একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র।
হাতিদের হারানো পথ
বাংলাদেশের বন্য হাতিদের অবস্থাও উদ্বেগজনক।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও ময়মনসিংহ বিভাগে এখনো বন্য হাতি আছে। কিন্তু তাদের চলাচলের প্রাচীন পথগুলোর অনেকগুলোই দখল হয়ে গেছে।
যেখানে একসময় হাতিরা নির্বিঘ্নে চলাচল করত, সেখানে এখন রাস্তা, বসতি, রিসোর্ট কিংবা কৃষিজমি। ফলে মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়ছে।
যেখানে একসময় হাতিরা নির্বিঘ্নে চলাচল করত, সেখানে এখন রাস্তা, বসতি, রিসোর্ট কিংবা কৃষিজমি। ফলে মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়ছে।
প্রতি বছর হাতি মারা যাচ্ছে। মানুষও মারা যাচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, হাতিরা কোনো নতুন জায়গায় ঢুকছে না। বরং তাদের শত শত বছরের পুরোনো পথগুলো আমরা বন্ধ করে দিয়েছি।
চিত্রা হরিণ এখনো সুন্দরবনে তুলনামূলক ভালো সংখ্যায় আছে। কিন্তু দেশের অন্য অনেক জায়গা থেকে হরিণ প্রায় হারিয়ে গেছে।
বিভিন্ন প্রজাতির বানরও একই সমস্যায় ভুগছে। বন ছোট হয়ে যাচ্ছে, খাবার কমছে, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে আবাসস্থল।
এদিকে নদীর ডলফিনও বিপদে। নদী দূষণ, জাল, নৌযান আর নদীর পরিবর্তিত প্রবাহ তাদের জন্য নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রাণীগুলো আলাদা হলেও সমস্যাটা একই, বাসস্থান হারানো।
প্রাণীগুলো আলাদা হলেও সমস্যাটা একই, বাসস্থান হারানো।
প্রশ্নটা প্রায়ই আসে—একটা ভাম, একটা হগ ব্যাজার কিংবা একটা মেছো বিড়াল না থাকলে এমন কী ক্ষতি?
ক্ষতি আছে। অনেক ক্ষতি।
ক্ষতি আছে। অনেক ক্ষতি।
বনের ফল খেয়ে বীজ ছড়ায় বিন্টুরং। বন পুনর্জন্ম নিতে সাহায্য পায়।
মেছো বিড়াল ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ করে। কৃষকের উপকার করে।
শিয়াল মৃত প্রাণী খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে।
উদবিড়াল জলজ পরিবেশের স্বাস্থ্যের সূচক হিসেবে কাজ করে।
বাঘ নিয়ন্ত্রণ করে তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা।
হাতি বন তৈরি করে। তাদের হাঁটার পথ ধরে জন্ম নেয় নতুন গাছপালা।
অর্থাৎ বন্যপ্রাণী শুধু বনের সৌন্দর্য নয়; তারা প্রকৃতির কর্মী।
তাদের বাদ দিলে পুরো ব্যবস্থাটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আমরা মানুষ নিজেদের পৃথিবীর মালিক ভাবতে ভালোবাসি।
আমরা মানুষ নিজেদের পৃথিবীর মালিক ভাবতে ভালোবাসি।
কিন্তু সত্যি বলতে, এই গ্রহে আমরা নতুন অতিথি। আমাদের অনেক আগে থেকে এখানে ছিল বন, নদী, হাতি, বাঘ, ডলফিন, ভাম, গন্ধগোকুল আর অসংখ্য প্রাণী।
আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পরিবেশ রক্ষার কথা বলা হবে। বন রক্ষার কথা বলা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলা হবে।
কিন্তু পরিবেশ মানে শুধু গাছ নয়।
কিন্তু পরিবেশ মানে শুধু গাছ নয়।
পরিবেশ মানে সেই গাছে বসে থাকা পাখিটাও। বাঁশঝাড়ে লুকিয়ে থাকা বিন্টুরংও। শহরের প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো হগ ব্যাজারও। সুন্দরবনের বাঘও। পাহাড়ের হাতিও।
কয়েক বছর আগে নাসিরনগরে একটি বাঁশভালুক মারা গিয়েছিল মানুষের হাতে। শেরপুরের হগ ব্যাজারটি বেঁচে গিয়েছিল অল্পের জন্য।
কয়েক বছর আগে নাসিরনগরে একটি বাঁশভালুক মারা গিয়েছিল মানুষের হাতে। শেরপুরের হগ ব্যাজারটি বেঁচে গিয়েছিল অল্পের জন্য।
এই দুই ঘটনার মাঝখানেই যেন বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীর ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে।
আমরা কি অচেনা বলে মেরে ফেলব? নাকি বোঝার চেষ্টা করব?
আমরা কি অচেনা বলে মেরে ফেলব? নাকি বোঝার চেষ্টা করব?
সিদ্ধান্তটা আমাদেরই। কারণ পৃথিবীটা শুধু মানুষের নয়। ওদেরও।







