বৃষ্টি রাতের খুনি গর্ডন

১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাবানলে তখন গোটা ইউরোপ প্রজ্বলিত। এডলফ হিটলারের লুফটওয়াফে বাহিনীর মুহুর্মুহু বিমান হামলার ভয়ে লন্ডন শহর তখন প্রতি রাতে পুরোপুরি অন্ধকার বা ‘ব্ল্যাকআউট’-এর চাদরে ঢেকে রাখা হতো। গাড়ির হেডলাইটেও ছিল কালো কাপড়ের প্রলেপ। এমন এক ভুতুড়ে ও থমথমে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর অবিরাম ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। ঠিক সেই বৃষ্টিভেজা অন্ধকার রাতেই লন্ডনের রাস্তায় বেরিয়ে আসত এক রক্তপিপাসু শিকারি। লন্ডনের ইতিহাসের পাতায় সে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘দ্য ব্ল্যাকআউট রিপার’ নামে।
তার আসল নাম ছিল গর্ডন ফ্রেডরিক কামিন্স। যুদ্ধের ভয়াবহতাকে পেছনে ফেলে এক সাধারণ ব্রিটিশ এয়ারম্যান কীভাবে এক নৃশংস সিরিয়াল কিলারে পরিণত হয়েছিল, তা ক্রাইম ইতিহাসের এক অন্যতম রোমাঞ্চকর ও শিহরন জাগানিয়া অধ্যায়।
যুদ্ধের কারণে গোটা লন্ডন তখন এক অদ্ভুত মানসিক চাপে দিন কাটাচ্ছিল। সাইরেনের শব্দ, বাংকারের জীবন আর ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে চলা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অন্ধকার ছিল এক নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু এ অন্ধকারই অপরাধীদের জন্য তৈরি করেছিল এক উর্বর ভূমি।
১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। লন্ডনের সোয়ো এলাকার একটি অন্ধকার ও বৃষ্টিস্নাত গলি থেকে উদ্ধার করা হয় ইভলিন ওয়ার্ড নামের এক নারীর নিথর দেহ। তাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। পুলিশ প্রথমে ভেবেছিল এটি হয়তো সাধারণ কোনো চুরি বা ছিনতাইয়ের জের ধরে ঘটে যাওয়া ঘটনা। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে একের পর এক নারী খুন হতে লাগলেন। মার্গারেট ম্যাক্সওয়েল, মার্গারেট হেলি, ডরিস রবসন— সবাইকে প্রায় একই কায়দায় হত্যা করা হয়।
প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সময় আবহাওয়া ছিল প্রায় একইরকম— স্যাঁতসেঁতে, কনকনে ঠান্ডা এবং অবিরাম বৃষ্টি। বৃষ্টির শব্দ মানুষের চিৎকার বা গোঙানিকে ঢেকে দিত আর ব্ল্যাকআউটের কারণে ঘুটঘুটে অন্ধকার আড়াল করত অপরাধীর মুখ।
তদন্তে নেমে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দারা দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন। কোনো ক্লু ছিল না, কোনো প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না। শুধু পড়ে ছিল কিছু আলামত। আর সেই আলামতই একসময় পুলিশকে নিয়ে গেল রাজকীয় বিমানবাহিনীর এক সদস্যের কাছে— তার নাম গর্ডন ফ্রেডরিক কামিন্স। কামিন্স দেখতে বেশ স্মার্ট ও সুদর্শন ছিলেন। কিন্তু তার এই মার্জিত ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক চরম বিকৃত মনস্তত্ত্ব। যুদ্ধের মানসিক চাপ এবং রক্তপিপাসা তাকে ধীরে ধীরে এক ভয়ংকর অপরাধীতে রূপ দিয়েছিল।
চতুর্থ হত্যাকাণ্ডের ঠিক পরেই গোয়েন্দারা অপরাধের ঘটনাস্থলে পাওয়া কিছু আলামতের সূত্র ধরে কামিন্সের মুখোমুখি হন। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড যখন তাকে গ্রেপ্তার করে, তখন তার রুম থেকে উদ্ধার হয় নিহত নারীদের কিছু জিনিসপত্র এবং সামরিক বাহিনীতে ব্যবহারের কিছু সামগ্রী। প্রমাণগুলো এত শক্ত ছিল যে, কামিন্সের পক্ষে বাঁচার কোনো রাস্তা ছিল না।
১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসে ওল্ড বেইলি আদালতে গর্ডন কামিন্সের বিচার শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হতে বেশি সময় লাগেনি। বিচারক যখন তাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনান, তখন তার মুখে কোনো অনুশোচনা বা ভয়ের লেশমাত্র ছিল না। ১৯৪২ সালের জুন মাসে ওয়ান্ডসওয়ার্থ জেলে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে গর্ডনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।




