মন্ত্রীর ঘরেই মোস্ট ওয়ান্টেড

আঁকা : সোহানুর রহমান
হত্যা মামলার এক আসামি লুকিয়ে ছিলেন ঢাকায় এক মন্ত্রীর বাসায়। তাকে ধরার জন্য বাসভবন ঘিরে ফেলে পুলিশ। তারপর? লিখেছেন শুভ রহমান
১৯৮২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর মিন্টো রোডে যুব উন্নয়নমন্ত্রী আবুল কাশেমের সরকারি বাসভবন ঘিরে তৈরি হয়েছে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। পুলিশের লক্ষ্য, বাড়িটির ভেতরে অবস্থান নেওয়া ইমদাদুল হক ওরফে ইমদুকে গ্রেপ্তার করা। গাজীপুরের কালীগঞ্জ থেকে রাজধানী পর্যন্ত যার নাম জড়িয়ে ছিল একের পর এক হত্যা, সশস্ত্র সংঘর্ষ ও ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে; সেই ইমদুকে ধরতে শেষ পর্যন্ত তৎপর হয়ে ওঠে পুলিশ প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের নাগালের বাইরে থাকা এই ব্যক্তিকে ধরতে মন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করে পুলিশ। শেষমেশ সেদিন বিকালে গ্রেপ্তার করা হয় ইমদুকে।
মাত্র দেড় মাস পর, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ, সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেন।
ইমদুর বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার সাতানিপাড়া গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর তিনি জাসদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। স্থানীয় জাসদ নেতা আলী হোসেন ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইমদুর বিরুদ্ধে সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ বাড়তে থাকে। পরে তিনি রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেন। ১৯৭৯ সালে যুব উন্নয়নমন্ত্রী আবুল কাশেমের বাসায় গিয়ে তার দলে যোগ দেন।
ইমদুর বিরুদ্ধে শুধু প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ নয়, একসময়কার সহযোগীদের হত্যার অভিযোগও ওঠে
তবে রাজনৈতিক কারণে নয়; কালীগঞ্জের অপরাধজগতে ইমদুর নাম বিশেষভাবে আলোচনায় আসে একের পর এক সন্ত্রাসী কাজের কারণে। তার বিরুদ্ধে শুধু প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ নয়, একসময়কার সহযোগীদের হত্যার অভিযোগও ওঠে। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব ক্রমে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়। কালীগঞ্জের রেললাইনের দুপাশে আলী হোসেন ও ইমদুর অনুসারীদের আলাদা প্রভাব ছিল। দুপক্ষের বিরোধ বাড়তে থাকলে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি হামলা ও হত্যাকাণ্ড। সেই সংঘাতের পরিণতিতে একাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারান।
১৯৭৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর কালীগঞ্জের কামারিয়া গ্রামের আজিজকে হত্যার অভিযোগ ওঠে ইমদুর বিরুদ্ধে। আজিজকে তার ভাইয়ের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তার মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছিল।
এরপর ১৯৮০ সালের ৪ এপ্রিল মসলিন কটন মিলের শ্রমিক আবদুর রশিদকে হত্যার অভিযোগ সামনে আসে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইমদু ও তার সহযোগীরা রশিদকে ধরে তার বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তার মাকে ছেলের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করতে বলা হয়েছিল বলে ওই সময়কার পত্রিকায় বর্ণনা রয়েছে। এরপর রশিদকে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার মরদেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
১৯৮১ সালের মার্চে আবদুল মজিদ নামের এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগে ইমদুর নাম আবারও সামনে আসে। ১৮ মার্চ মজিদ কালীগঞ্জ থানার সুকুন্দিয়া গ্রামে বোন আয়াত বানুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। আনুমানিক রাত আড়াইটায় ইমদুর লোকজন বাড়িটি ঘিরে ফেলে। মজিদকে ঘুম থেকে তুলে হত্যা করা হয়। তার ভাই হাকিমকেও পরে হত্যা করা হয়। মজিদের হত্যাকাণ্ডে মামলা করার কারণে ইমদু ক্ষুব্ধ ছিলেন হাকিমের ওপর। পরে ইমদুর মৃত্যুদণ্ডের রায়ে যে মামলাগুলো প্রভাব ফেলে তার মধ্যে মজিদ হত্যা মামলাও ছিল।
একসময় ইমদুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আলী হোসেনের সঙ্গেও তার বিরোধ সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক অবস্থান ও দলীয় আনুগত্য নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল। ১৯৮১ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকার তেজগাঁও রেলওয়ে কলোনি এলাকায় আলী হোসেনকে হত্যার অভিযোগ আছে ইমদুর বিরুদ্ধে। তার সহযোগী চানু ভূঁইয়াকেও গুলি চালিয়ে হত্যা করে ইমদুর লোকজন।
এপ্রিল মাসেই কালীগঞ্জের মসলিন কটন মিলের কাছে ইমদুর অনুসারীদের আরেকটি হামলার বিবরণ তৎকালীন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে মাইকিং করা কয়েকজনের ওপর হামলা চালানো হয় এবং তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতদের একজনের মরদেহ বাঁশের সঙ্গে বেঁধে এলাকায় ঘোরানো হয়েছিল। তবে নিহত ব্যক্তিদের নাম এবং ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়নি। ইমদুর বিরুদ্ধে অপহরণ ও জমি দখলের অভিযোগও ছিল। কালীগঞ্জের আবদুল আউয়াল ভূঁইয়ার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে তার বাহিনীর বিরুদ্ধে। পরিবারটিকে ঘিরে আরও সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হলে আবদুল আউয়াল পরিবার নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান। এরপর তাদের জমিজমা দখল করে নেওয়া হয়।
অপরাধের এসব অভিযোগের মধ্যেই ইমদুকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ তৎপরতা চালাতে থাকে। তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা সফিক উল্লাহর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ১৯৮২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খবর আসে, ইমদু পল্টনে এক রাজনৈতিক কার্যালয়ে যেতে পারেন। সুবেদার খালেকের নেতৃত্বে একটি দলকে প্রস্তুত করা হয়। পরে খবর পাওয়া যায়, ইমদু যুব উন্নয়নমন্ত্রী আবুল কাশেমের মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে অবস্থান করছেন। সেখানে পুলিশ পৌঁছালে তিনি বাড়ির একটি ঘরে নিজেকে আটকে ফেলেন বলে ওই স্মৃতিচারণে বর্ণনা রয়েছে। খবরটি দ্রুত ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সঙ্গে কথা বলার পর ইমদুকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। সব শঙ্কার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত সেদিন বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ইমদু বাসভবন থেকে বেরিয়ে এলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাটি নিয়ে পরে নানা রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। এরশাদ সামরিক শাসন জারির সময়ও মন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে একজন অভিযুক্ত খুনির অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরে তৎকালীন সরকারের সমালোচনা করেছিলেন। ফলে সে সময় অনেকেরই ধারণা হয়েছিল, গ্রেপ্তারের পুরো ঘটনাটি হয়তো সাজানো। সামরিক শাসনকে জাস্টিফাই করার জন্য এমনটি ঘটানো হয়েছে।
তবে গ্রেপ্তারটি পূর্বপরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা থাকলেও বিষয়টি নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
এরশাদের সামরিক শাসনামলে ইমদুর বিচার সামরিক আদালতে অনুষ্ঠিত হয়। তার বিরুদ্ধে পাঁচটি হত্যা মামলা উত্থাপন করা হয়েছিল। দুটি মামলায় ইমদু ও তার তিন সহযোগীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। আবদুল মজিদ হত্যা মামলাটি ছিল সেই বিচার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৮২ সালের ৪ আগস্ট ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ইমদুর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।



