রীমা ছিলেন পথের কাঁটা

আঁকা: সোহানুর রহমান
চেয়েছিলেন সুখের সংসার কিন্তু অল্প সময়ের দাম্পত্য জীবনে পরকীয়ায় আসক্ত স্বামীর কাছে পেয়েছেন অবহেলা। শেষে জীবনটাই দিতে হয়েছিল শারমিন রীমাকে। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো শুধু আদালতের নথিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মানুষের স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে দীর্ঘদিনের জন্য। আশির দশকের শেষদিকে ঘটে যাওয়া শারমিন রীমা হত্যা মামলাও তেমনই একটি ঘটনা। প্রেম, পরকীয়া, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বিশ্বাসঘাতকতা এবং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড— সবকিছু মিলিয়ে মামলাটি সে সময় গোটা দেশ নাড়িয়ে দিয়েছিল।
১৯৮৯ সালের ১০ এপ্রিল। ভোরের আলো তখন মাত্র ফুটতে শুরু করেছে। নারায়ণগঞ্জের মিজমিজি এলাকার পাশ দিয়ে যাওয়া সড়কে পথচারীরা কেবল চলাচল শুরু করেছেন। এমন সময় রাস্তার ধারে পড়ে থাকা এক তরুণীর নিথর দেহ দেখে থমকে যান কয়েকজন। মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে যায় পুলিশ।
তরুণীর শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। কিন্তু ঘটনাস্থলের একটি বিষয় সবাইকে বিস্মিত করে। নিহতের শরীরে থাকা সোনার গয়না খোয়া যায়নি। ছিনতাই বা ডাকাতির ঘটনায় সাধারণত মূল্যবান অলংকার নিয়ে পালিয়ে যায় অপরাধীরা, অথচ এখানে সেসবের কিছুই স্পর্শ করা হয়নি। ফলে তদন্তকারীরা দ্রুতই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, হত্যার উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তিগত। আর এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। ঘটনাস্থলের আশপাশে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলামতও উদ্ধার করে। কাছের একটি খাল থেকে পাওয়া যায় রক্তমাখা একটি প্যান্ট ও একটি ধারালো ছুরি।
তরুণীর পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর চাঞ্চল্য আরও বাড়ে। নিহত শারমিন রীমা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমেদের মেয়ে। স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়া একজন শহীদ বুদ্ধিজীবীর মেয়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। আরও হৃদয়বিদারক ছিল একটি তথ্য— রীমার বিয়ে হয়েছিল মাত্র চার মাস আগে। ১৯৮৮ সালের ১১ ডিসেম্বর পারিবারিক আয়োজনে তার বিয়ে হয় মুনীর হোসেন সুরুজের সঙ্গে। নতুন সংসারের স্বপ্ন তখনো ভাঙেনি, ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল অসংখ্য পরিকল্পনা। কিন্তু সেই স্বপ্নের পরিসমাপ্তি ঘটে অপ্রত্যাশিতভাবে।
মুনীরও ছিলেন শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সন্তান। তার বাবা ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. আবুল কাশেম এবং মা খ্যাতিমান স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেহেরুন্নেসা। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে তিনি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ব্যবসা শুরু করেন। বাইরে থেকে দেখলে এই বিয়ে ছিল দুটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের বন্ধন। কিন্তু সেই সম্পর্কের ভেতরে ধীরে ধীরে জমতে থাকে অবিশ্বাসের মেঘ।
তদন্তে উঠে আসে, বিয়ের আগেই মুনীরের সঙ্গে হোসনে আরা খুকু নামে এক নারীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। পরিচয়ের সূত্র ছিল মুনীরের মায়ের ক্লিনিক। সময়ের সঙ্গে সেই পরিচয় পরকীয়ায় রূপ নেয়। বিয়ের পরও তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ চলতে থাকে। সেই সম্পর্কই রীমার দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হয়।
স্বামীর আচরণের পরিবর্তন খুব দ্রুতই টের পান রীমা। সংসারে দূরত্ব বাড়তে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হন। পরে মুনীর স্ত্রীকে আশ্বাস দেন যে, তিনি অতীতের সম্পর্ক থেকে সরে এসেছেন এবং নতুন করে সংসার শুরু করতে চান। কিন্তু তদন্তে উঠে আসে, বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
১৯৮৯ সালের ৯ এপ্রিল রাতে স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে বের হন মুনীর। ভ্রমণের কথা বলে তিনি গাড়ি চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে যান। তদন্তে প্রকাশ পায়, গভীর রাতে নির্জন এলাকায় পৌঁছে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাকে হত্যা করা হয়। পরে আলামত গোপনেরও চেষ্টা করা হয়েছিল।
মামলার তদন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন মোড় নেয়। পুলিশ মুনীরকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তে পরকীয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায় এবং সেটিকেই হত্যার অন্যতম সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা হয়। এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর দেশ জুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। জাতীয় দৈনিকগুলো ধারাবাহিকভাবে মামলার অগ্রগতি প্রকাশ করতে থাকে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নারী অধিকারকর্মীরাও এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন। অনেকের কাছে এটি ছিল নারীর প্রতি সহিংসতা ও সম্পর্কের ভাঙনের এক নির্মম প্রতীক।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় বহু সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়। ১৯৯০ সালের ২১ মে বিচারিক আদালত রায় দেন। সেই রায়ে মুনীর হোসেন সুরুজ ও হোসনে আরা খুকুর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। তবে আইনি লড়াই সেখানে শেষ হয়নি। উচ্চ আদালতে আপিলের পর সাক্ষ্য-প্রমাণ নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়। শেষ পর্যন্ত মুনীরের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও প্রমাণের অভাবে হোসনে আরা খুকুকে খালাস দেওয়া হয়।
মুনীরের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনও শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ১৯৯৩ সালের মাঝামঝি সময়ে মুনীর হোসেন সুরুজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এ মামলার বিচারিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।






