এই ববি আসল নয়!

লেসলি ডানবারের সঙ্গে ব্রুস
শৈশবে হারিয়ে গিয়েছিলেন ববি ডানবার। ফিরেও আসেন। একটা পুরো জীবন কাটিয়ে মারা যান। অথচ আধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তি বলছে, তিনি ববি ছিলেনই না। লিখেছেন শুভ রহমান
এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, কোনো গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানার এক লেকের ধারে একটি ছোট্ট পরিবারের আনন্দঘন পিকনিক মুহূর্তেই রূপ নেয় জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নে, যা একই সঙ্গে জন্ম দেয় শতবর্ষের এক অমীমাংসিত মনস্তাত্ত্বিক রহস্য— ববি ডানবারের অন্তর্ধান।
১৯১২ সালের আগস্ট মাসের শেষদিকে, পার্সি ডানবার ও লেসলি ডানবার দম্পতি তাদের চার বছরের শিশুপুত্র রবার্ট রবার্টসন ‘ববি’ ডানবারকে নিয়ে লুইজিয়ানার সোয়ালো লেকে পিকনিকে গিয়েছিলেন। খোলা জায়গা পেয়ে ববি ও তার ছোট ভাই চার্লি চারদিকে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছিল।
দুপুরের দিকে হঠাৎ করেই ববি উধাও হয়ে যায়। প্রথমে পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন, শিশুসুলভ চপলতায় সে হয়তো আশপাশে কোথাও লুকিয়ে আছে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যখন তার কোনো সন্ধান মিলছিল না, শুরু হয় তৎকালীন সময়ের অন্যতম এক বিশাল পুলিশি তল্লাশি অভিযান। লেকের পানি থেকে শুরু করে বনের প্রতিটি কোণ তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়। কিন্তু ববির কোনো খোঁজ মেলেনি। চার দিনের তল্লাশি শেষে যখন পুলিশের হাত শূন্য, তখন দেশ জুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় শিরোনাম হতে থাকে নিখোঁজ ছোট্ট ববির মুখ।
ববি হারিয়ে যাওয়ার ঠিক আট মাস পর, ১৯১৩ সালের এপ্রিলে মিসিসিপির পপলারভিলের এক এলাকা থেকে নাটকীয়ভাবে এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। উইলিয়াম ওয়াল্টার্স নামের এক ব্যক্তি সেই শিশুটিকে নিজের হেফাজতে রেখেছিলেন। ওয়াল্টার্স দাবি করেন, শিশুটির নাম চার্লস ব্রুস অ্যান্ডারসন। তিনি দাবি করেন, শিশুটির মা জুলিয়া অ্যান্ডারসন নামের এক দরিদ্র নারী তাকে শিশুটির দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ যখন ছবি ও বিবরণ মেলাল, তখন তারা অদ্ভুত এক সিদ্ধান্তে পৌঁছাল। ডানবার পরিবারকে ডেকে পাঠানো হলো শিশুটিকে শনাক্ত করার জন্য।
লেসলি ডানবার প্রথমে শিশুটিকে দেখে কিছুটা দ্বিধায় পড়েন। তিনি স্পষ্টতই বুঝতে পারছিলেন না এটি তার সন্তান কি না। কিন্তু পরদিন যখন শিশুটিকে গোসল করানো হয় এবং তার শরীরের বিশেষ কিছু জন্মদাগ পরীক্ষা করা হয়, তখন লেসলি হঠাৎ করেই বলে ওঠেন— ‘এ আমার ববি! এ ছাড়া আর কেউ হতে পারে না!’
অন্যদিকে, জুলিয়া অ্যান্ডারসন নামের সেই দরিদ্র নারী দাবি করেন, শিশুটি তার নিজের সন্তান ‘ব্রুস’। আদালত রায় দেয়, শিশুটি আসলেই ববি ডানবার এবং তাকে আইনিভাবে ডানবার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মন ভেঙে যাওয়া জুলিয়া একা শূন্যহাতে ফিরে যান।
ববি ডানবার হিসেবে বড় হওয়া সেই শিশুটি একসময় পূর্ণবয়স্ক হন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে শুরু করেন। তার বিয়ে হয়, সন্তানাদি হয় এবং তিনি ১৯৭৭ সালে মারা যান। ববি বিশ্বাস করতেন, তিনিই আসল ববি ডানবার। কিন্তু গল্পের আসল টুইস্ট আসে তার মৃত্যুর অনেক পরে, ২০০৪ সালে।
ববির নাতনি মার্গারেট ডানবার এডওয়ার্ডস সিদ্ধান্ত নেন প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে এ ঘটনার সত্যতা যাচাই করবেন। ততদিনে ডিএনএ টেস্টের আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। মার্গারেট যোগাযোগ করেন ববির ভাই চার্লির বংশধরদের সঙ্গে।
শুরু হয় ডিএনএ প্রোফাইলিং। ববি ডানবারের নিজের এক সন্তানের রক্ত এবং ডানবার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ডিএনএ স্যাম্পল ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হলো পরীক্ষার জন্য। ডিএনএ পরীক্ষার ফল যখন হাতে এলো, সেই ফলাফলে পরিষ্কার হয়ে গেল— যে ব্যক্তিকে আজীবন ‘ববি ডানবার’ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছিল, যাকে ডানবার পরিবার নিজের সন্তান বলে দাবি করেছিল— তিনি আদতে ডানবার পরিবারের রক্তই নন! তার ডিএনএ ডানবার পরিবারের সঙ্গে বিন্দুমাত্র মেলেনি।
বরং তদন্তকারীরা বুঝতে পারলেন, ডানবার পরিবার যে শিশুকে উদ্ধার করেছিল, সে আসলে জুলিয়া অ্যান্ডারসনেরই সন্তান— ব্রুস অ্যান্ডারসন! তাহলে আসল ববি ডানবারের ভাগ্যে কী ঘটেছিল? হয়তো সে লেকের পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল কিংবা কুমিরের বা বন্য প্রাণীর শিকারে পরিণত হয়েছিল।





