কে ডাকে

আঁকা : নওরিন জাহান শর্মী
আমি যে কিন্ডারগার্টেনে পড়তাম, সেটা চারপাশে জঙ্গলের মতো ছিল। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে, টিফিন টাইমে, কিংবা স্কুল ছুটির পর ওই বন চষে বেড়ানো ছিল আমার নিয়মিত কাজ। একদিনের ঘটনা। ক্লাস ছুটি হয়ে গেছে। ক্লাসমেট অভিকে নিয়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে জঙ্গলে ঢুকলাম, কাঁধে ব্যাগ। জঙ্গলের বেশ ভেতরে একটা ডোবা আছে, শ্যাওলা আর কচুরিপানায় ভর্তি। ডোবার পাড়ে এসে দাঁড়ালাম আমরা। আচমকা অভি ‘এই দেখ দেখ’ বলে ডোবার দিকে আঙুল তাক করল। সরল বিশ্বাসে ঝুঁকে জিনিসটা দেখার চেষ্টা করতেই আমাকে ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলে দিল ও। ব্যাপার বুঝে উঠতে কয়েক মুহূর্ত লেগে গেল। অভি ততক্ষণে হাওয়া! পানিতে পড়ে প্রথমে ডুবে গিয়েছিলাম পুরোপুরি, তারপর ভুস করে ভেসে উঠেছে মাথাটা। সারা গায়ে সবুজ কাদা মেখে ভূত হয়ে গেছি। পাড়ের কাছেই পড়েছিলাম আমি। কিন্তু ওই জায়গাতে এত পানি যে গলা পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। তার ওপর গায়ে পড়ছে বৃষ্টির ফোটা। ঠান্ডায় কেঁপে উঠল শরীরটা। পাড় আঁকড়ে ধরে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে ঝুপ করে পড়লাম আবার স্কুল-অফিস অনেক দূরে এখান থেকে। কাজেই যতই গলা ফাটাই না কেন, কারও কানে সে আওয়াজ যাওয়ার সম্ভাবনা কম। আকাশে মেঘ। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। ভয়ে আতঙ্কে ভ্যা করে কেঁদে ফেললাম। হঠাৎ শুনি, ‘ডিউক?’
জানে পানি এলো। গলার রগ ফুলিয়ে সাড়া দিলাম, ‘এই যে এখানে!’
‘ডিউক? ডিউক?’ আবার ডাকল কণ্ঠটা। মোলায়েম, বাচ্চা ছেলের আদুরে গলা। বহুদূর থেকে ভেসে আসছে যেন। চেঁচালাম কণ্ঠের মালিকের উদ্দেশে। কান পেতে আছি বাতাসে। ‘ডিউক! এই ডিউক!’
ভয় পেলাম এবার। তারপর আরেকটা কথা মনে হতে ভয়টা রূপ নিল আতঙ্কে। ডোবা থেকে কিছুটা দূরে আছে একটা পুকুর। কদিন আগে সেই পুকুরে একটা ছেলে ডুবে মারা গেছে। ‘ডিউক!’ আওয়াজটা এবার কানের একেবারে কাছে। চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকালাম, কাউকে দেখতে পেলাম না আশপাশে। তক্ষুনি কী যে হলো আমার! হাত-পা ছুড়ে কীভাবে যে ডাঙায় উঠে এলাম, নিজেও জানি না। তারপর? মিস, বড় আপা, ভূত ভূত বলে ভোঁ-দৌড় দিলাম অফিস বিল্ডিংয়ের দিকে।




