দ্বিতীয় দাফন

পাথরের ফাটল গলে হেঁটে বেড়াতে দেখা যায় এক বিশাল কুকুরের অশরীরী ছায়া
রাত তখন গভীর। আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের বুক চিরে বয়ে চলা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর মেঘের আড়ালে ঢাকা চাঁদের আলোয় গ্লাসনেভিন গোরস্তানের লোহাঝালাই করা বিশাল গেটগুলো কেমন যেন এক অন্য পৃথিবীর ইশারা দেয়। দিনের বেলা এটি একটি ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা হলেও, ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত ছুঁলেই এখানকার ১২৪ একরের প্রতিটি প্রান্তর পরিণত হয় এক ভয়ংকর অতিলৌকিক রাজ্যে। ঝাপসা কুয়াশা, পাথরে খোদাই করা ক্রুশগুলোর দীর্ঘ ছায়া আর ভিন্টেজ ক্রিপ্টগুলোর পেছনে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য দৃষ্টি— সব মিলিয়ে এক গা-ছমছমে শিহরন খেলে যায় মেরুদণ্ডে।
এই বিশাল কবরখানার শত শত অশরীরী কাহিনির মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও রক্ত হিম করা গল্পটি একটি কুকুরের। ১৮৬১ সালের এক ভয়াল ঝড়ের রাতে ডাবলিনের ডান লাওঘায় আছড়ে পড়েছিল ‘দ্য নেপচুন’ নামের একটি জাহাজ। প্রবল জলোচ্ছ্বাসের মুখে জাহাজটিকে বাঁচাতে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় ক্যাপ্টেন জন ম্যাকনিল বয়েডের। তার মরদেহ যখন সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা হয়, তখন তার পাশেই পাহারা দিচ্ছিল তার পোষা বিশাল নিউফাউন্ডল্যান্ড জাতের কুকুরটি।
ক্যাপ্টেনের মরদেহ গ্লাসনেভিন গোরস্তানে সমাহিত করার পরদিন থেকেই শুরু হয় সেই মর্মান্তিক অপেক্ষা। দিন যায়, রাত আসে, রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে কুকুরটি তার প্রভুর কবরের ওপর থেকে একচুলও নড়েনি। অবশেষে ক্ষুধা ও গভীর শোকে কবরের পাশেই মারা যায় সে। কিন্তু মৃত্যুর পরেও কি তার সেই আনুগত্য ফুরিয়েছিল?
স্থানীয়দের বিশ্বাস, আজও ফুরোয়নি! গ্লাসনেভিনের ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে আজও পাথরের ফাটল গলে হেঁটে বেড়াতে দেখা যায় এক বিশাল কুকুরের অশরীরী ছায়া। মাঝরাতে কবরের ওপর দিয়ে তার নখের খটখট শব্দ আর নুড়িপাথরের ওপর নরম পায়ের আওয়াজ শুনতে পান নৈশপ্রহরীরা। সেন্ট প্যাট্রিক ক্যাথেড্রালে ক্যাপ্টেনের স্ট্যাচুর আশপাশেও নাকি মাঝেমধ্যে শোনা যায় এক অদৃশ্য কুকুরের দীর্ঘশ্বাস আর নিঃশব্দ কান্নার আওয়াজ!
শুধু সেই বিশ্বস্ত কুকুরটিই নয়, গ্লাসনেভিনের অলিগলি যেন হেঁটে বেড়ায় শত শত অতৃপ্ত আত্মা। কবরখানার কর্মীরা বারবার বলেছেন, দিনের বেলা ঝকঝকে পরিবেশ থাকলেও রাত নামলেই সেখানে শুরু হয় অদ্ভুত সব কাণ্ড। কোনো দৃশ্যমান মানুষ নেই, অথচ পাথুরে চত্বরে ইকো তুলে বেড়ায় খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার জোরালো শব্দ। কেউ কানের কাছে ফিসফিস করে নাম ধরে ডেকে ওঠে, আবার কেউ পেছন থেকে ডাকতে থাকে অচেনা ভাষায়।
কখনোবা দেখা যায়, উনিশ শতকের ভিক্টোরিয়ান আমলের ভারী কালো শোকের পোশাকে সেজে থাকা কিছু নারী মূর্তি হঠাৎ করেই কোনো বিশাল মনোলিথ বা মোসোলিয়ামের আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে। গ্লাসনেভিনের মাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন কিছু ঘটনা, যা বিশ্বাস করতেও বুক কেঁপে ওঠে। ১৭০৫ সালে মারা যান মারজরি ম্যাককল। তাকে সৎকার করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গোরস্তানে হানা দেয় একদল লোভী বডি স্ন্যাচার। কবরের মাটি খুঁড়ে মৃতদেহটি তোলার পর তারা মারজরির আংটি পরানো আঙুলটি কেটে নেওয়ার চেষ্টা করতেই ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা— কোমা বা ক্যাটাতোনিয়া থেকে হঠাৎ জেগে ওঠেন মারজরি!
আতঙ্কে চিৎকার করে পালিয়ে যায় সেই নরপিশাচরা। কোনোমতে নিজের বাড়িতে ফিরে দরজায় কড়া নাড়লে দরজা খুলেই ভয়ে অজ্ঞান হয়ে মারা যান তার স্বামী! মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা মারজরি এরপর আরও বহু বছর বেঁচে ছিলেন। মৃত্যুর পর তাকে যখন আবার বেলফাস্টের শ্যাংকহিল গোরস্তানে সমাহিত করা হয়, তখন আজও তার পাথরে খোদাই করা রয়েছে সেই হিমশীতল বাক্যটি: ‘Margorie McCall, Lived Once, Buried Twice.’
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়গুলোর সাক্ষী এই গ্লাসনেভিন। ১৮৪০-এর দশকের ‘গ্রেট ফ্যামিন’ বা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষের মৃতদেহ এখানে গণকবরে ফেলা হয়েছিল। নামহীন সেই লাখো মানুষের আর্তনাদ যেন মিশে আছে এখানকার বাতাসে। কলেরা মহামারীর দিনে তাড়াহুড়ো করে মাটিচাপা দেওয়া মৃতরা কিংবা দূর-দূরান্তের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা অচেনা সৈনিকদের দীর্ঘশ্বাস— সব মিলিয়ে গ্লাসনেভিনের মাটি এতটাই শোক ও যন্ত্রণায় ভারী যে, তা আজও শান্ত হতে পারেনি।






