স্কন্ধকাটা

আঁকা : অরবিন্দ হালদার
লোককথায় স্কন্ধকাটা হলো মাথাবিহীন মানুষের অবয়ব। স্কন্ধ শব্দের অর্থ কাঁধ আর কাটা অর্থ বিচ্ছিন্ন। স্কন্ধকাটার উৎপত্তি নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ইতিহাস নেই। গ্রামের প্রবীণদের মুখে মুখে প্রচলিত নানা গল্পে এর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কোথাও বলা হয়, বহু আগে সংঘটিত কোনো যুদ্ধ, ডাকাতের আক্রমণ বা সহিংস ঘটনার স্মৃতি থেকেই এমন গল্পের জন্ম। আবার কোথাও ধারণা করা হয়, কুয়াশা, অন্ধকার, মানুষের ভয় এবং কল্পনা মিলেই ধীরে ধীরে এই লোকবিশ্বাস গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় স্কন্ধকাটার বর্ণনাও এক নয়। কোথাও বলা হয়, গভীর রাতে নির্জন বাঁশঝাড়, পুরনো গাছ বা জনমানবহীন পথের পাশে মাথাবিহীন মানুষের অবয়ব দেখা যায়। আবার কোথাও বলা হয়, এটি দূরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এবং কেউ কাছে যাওয়ার আগেই অদৃশ্য হয়ে যায়। কিছু লোককথায় বলা হয়, এটি মানুষের কোনো ক্ষতি করে না।
স্কন্ধকাটা ভূত সাধারণত নদীর ধার, পুরনো শিমুল গাছ বা নির্জন মাঠের অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায়। এর চলাফেরার নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। তবে এটি মানুষের ওপর সরাসরি হামলা করে না বললেই চলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরা নিঃশব্দে হেঁটে বেড়ায় এবং কাউকে দেখলে অদ্ভুত ধরনের অস্ফুট শব্দ করে। রাতের অন্ধকারে দূর থেকে দেখলে অনেকেই একে জীবন্ত মানুষ মনে করে বিভ্রান্ত হন। কাছে গেলে যখন মাথা না থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে, তখন মানুষের ভয়ে জ্ঞান হারানোর উপক্রম হয়।
খেয়াল করলে দেখা যায়, স্কন্ধকাটাকে ঘিরে প্রচলিত অধিকাংশ গল্পেই বাঁশঝাড়, পুরনো গাছ, শ্মশান, কবরস্থান বা নির্জন পথের উল্লেখ রয়েছে। এর পেছনে বাস্তব কারণও থাকতে পারে। একসময় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের ব্যবস্থা ছিল না। রাতে বাঁশঝাড়ে বাতাস লাগলে অদ্ভুত শব্দ হতো। কুয়াশা, চাঁদের আলো, গাছের ছায়া এবং মানুষের স্বাভাবিক ভয় মিলিয়ে অনেক সময় দূরের কোনো গাছ, খুঁটি বা মানুষের ছায়াকেও অন্য রকম মনে হতে পারত। এমন পরিবেশ থেকেই হয়তো রহস্যময় এসব গল্পের জন্ম।
মজার বিষয় হলো, মাথাবিহীন মানুষের গল্প শুধু বাংলাতেই সীমাবদ্ধ নয়; ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মাথাবিহীন অশ্বারোহীকে নিয়ে লোককাহিনি রয়েছে। জাপানসহ আরও কয়েকটি দেশের লোকসাহিত্যেও বিচ্ছিন্ন দেহ বা অস্বাভাবিক মানবাকৃতির চরিত্র দেখা যায়।






