এটা আমাদের তুই চলে যা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
৩৭ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন চা বাগানে চাকরি করছেন সজল ইবাদ। বর্তমানে তিনি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার একটি চা বাগানের ব্যবস্থাপক। দীর্ঘ কর্মজীবনে এই অভিজ্ঞ টি প্লান্টার ব্যাখ্যার অতীত কিছু ঘটনার মুখোমুখিও হয়েছেন। কয়েকটি থাকল পাঠকের জন্য
সালটা ১৯৯০। নভেম্বর মাস। তখন আমি বড়লেখার পাল্লাথল চা বাগানে কর্মরত। আমাদের বাংলো থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে কালাইন শাহর মাজার। চারপাশে ঘন জঙ্গল। এ চা বাগানেই দল বাহাদুর নামে এক শিকারির সঙ্গে আমার পরিচয়। বাবা নেপালি, মা খাসিয়া। এলাকায় তুখোড় শিকারি হিসেবে পরিচিতি দল বাহাদুরের একটি দোনলা বন্দুক ছিল। আমি অনেক আগেই তাকে বলে রেখেছিলাম, হরিণ শিকারে গেলে আমাকে সঙ্গে নিতে হবে।
এক রাতে আমরা দুজন একটি আমলকী গাছের ওপর বাঁধা মাচায় বসলাম। নিচে জঙ্গল। চারদিক নিস্তব্ধ। মশা কামড়াচ্ছে; কিন্তু হাত দিয়ে মারার উপায় নেই। শব্দ হলেই শিকার নষ্ট হয়ে যাবে। দূরে কোথাও নিশাচর পাখির ডাক ভেসে আসছিল। বাকি সবকিছু সুনসান।
তখন গভীর রাত। সম্ভবত ২টার মতো বাজে। আমাদের চোখ গাছের নিচের খোলা জায়গাটায়। হঠাৎ শুকনো পাতার ওপর খসখস শব্দ শুনতে পেলাম। মনে হলো কেউ একজন হাঁটছে। কিছুক্ষণ পর অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি হরিণ বেরিয়ে এলো; কিন্তু সেটাকে দেখে আমার বুক ধক করে উঠল। আমি জীবনে অনেক হরিণ দেখেছি; কিন্তু এমন হরিণ কখনো দেখিনি। আকারে সাধারণ হরিণের চেয়ে অনেক বড়। মাথার শিংও অস্বাভাবিক বড়। মাটি থেকে অন্তত ফুট ১৫ ওপরে তার শিং। ওটা এসে আমলকী গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইল। দল বাহাদুরের চেহারা ফ্যাকাশে। সাহস করে বন্দুক তাক করল। তারপর কিছু না ভেবেই গুলি; কিন্তু গুলির শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল। হরিণটি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই জায়গাটা হঠাৎ সাদা ধোঁয়ায় ঢেকে গেল। একই সঙ্গে চারপাশে শুরু হলো তুমুল ঝড়। মনে হচ্ছিল পুরো জঙ্গল কেঁপে উঠছে।
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দল বাহাদুর আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল, ‘স্যার, ভাগেন! খারাপ জিনিস!’
তার গলার স্বর শুনে আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। আমরা দুজন মাচা থেকে নেমে দৌড় শুরু করলাম। যত দ্রুত পারি, ছুটতে লাগলাম জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। অনেক দূরে মূল রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর পর সাহস করে পেছনে তাকালাম।
আর তখনই দ্বিতীয়বারের মতো অবাক হলাম। ঝড়ের কোনো চিহ্ন নেই। গাছের পাতাও নড়ছে না। যেন কিছুই ঘটেনি।
আমি দেখলাম, দল বাহাদুর নিজের বুকে বারবার ক্রুশ আঁকছে।
দুই
২০০১ সালের ঘটনা। মৌলভীবাজারের রত্না চা বাগানে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। গরমের রাতে সবাই জানালা খুলে ঘুমাত। সেই সময় বাগানের লোকজনের মুখে একটি গল্প বেশ প্রচলিত ছিল। গভীর রাতে নাকি একটি ছোট মেয়ে ম্যানেজারের বাংলোসহ অন্য বাংলোগুলোর জানালার পাশে এসে দাঁড়াত। বয়স চার কিংবা পাঁচ বছর। গায়ে সাদা পোশাক। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়।
অনেকেই একই ঘটনা দেখেছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন তপন চক্রবর্তী নামের এক সাহসী চা বাগান ম্যানেজার। তার মুখেই বিস্তারিত শুনি।
এক রাতে মেয়েটি আবার আসে। তপনদা সাহস করে তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার নাম কী?’
মেয়েটি উত্তর দেয়, ‘মেরি।’
তারপরই দৌড়ে পালাতে শুরু করে। তপনদাও তার পেছনে ছুটে যান। বাংলোর পাশের একটি জঙ্গলে ঢুকে মেয়েটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। পরে জায়গাটা পরিষ্কার করতে গিয়ে সেখানে একটি পুরনো কবর পাওয়া যায়। কবরটি সংস্কার করা হয়। চারপাশ বাঁধানো হয়। একটি ক্রুশও বসানো হয় সেখানে। লোকজন বলে, এরপর আর কখনো মেরিকে দেখা যায়নি।
বহু বছর পর ২০১৬ সালে আমি আমার পরিবারকে নিয়ে সেই বাগানে যাই। মেরির কবরেও গিয়েছিলাম। সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল।
কিন্তু ফেরার পথে আমার মেয়ে অরিন হঠাৎ গাড়ির ভেতরে বলল, ‘মেরি আমার সঙ্গে আসবে।’
আমি ভেবেছিলাম, হয়তো সে মজা করছে।
কিন্তু পরদিন সকালে সে তার মাকে বলল, রাতে সাদা পোশাক পরা একটি মেয়ে তার মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল।
পরে শুনেছি, নতুন মালিক এসে সেই কবর ভেঙে ফেলেছেন। তবে মেরির গল্প এখনো বাগানের পুরনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
তিন
আমার জীবনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল ২০১৮ সালে। স্থান— শ্রীমঙ্গলের হরিণছড়া বাগান।
বাংলোটি ছিল বিশাল। দুটি বড় শোবার ঘর, একটি শিশুদের ঘর। অদ্ভুত কারণে বড় ঘরগুলোয় আমি কখনো স্বস্তি পেতাম না। তাই শিশুদের ছোট ঘরটিতেই ঘুমাতাম।
বাংলোর পেছনে ছিল গারো খ্রিস্টানদের পুরনো কবরস্থান। একদিন শিবলি সাহেব, যিনি আগে সেখানে ছিলেন, আমাকে বললেন, ‘ইবাদ, এক বছর হয়ে গেল। কিছু দেখনি?’
আমি হেসে বললাম, ‘না স্যার।’
তিনি বললেন, ‘গেস্টরুমে কেউ ঘুমাতে চায় না।’
তিনি আরও জানালেন, মাঝেমধ্যে নাকি ঘরের জিনিসপত্র নিজেরাই স্থান পরিবর্তন করে। আমি অবশ্য এসব বিশ্বাস করিনি।
তার কিছুদিন পরের ঘটনা। জুন মাস। রাত প্রায় ২টা। ঘুম ভেঙে গেল। পানি খেতে হবে। ডাইনিং রুমে গিয়ে পানি খেলাম। তারপর ফিরে আসতে গিয়ে হঠাৎ আমার চোখ পড়ল খাবার টেবিলের পাশে রাখা একটি চেয়ারে। সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকের ভেতরটা জমে গেল। চেয়ারটিতে বসে আছে একটি টাকমাথা বামন। ও আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমাদের চোখাচোখি হলো।
তারপর সে চিকন গলায় বলল, ‘এটা আমাদের। তুই চলে যা।’
আমি জীবনে অনেক ভয় পেয়েছি; কিন্তু সেই মুহূর্তের মতো ভয় আর কখনো পাইনি। মনে হচ্ছিল শরীরের সব শক্তি চলে গেছে।
তারপরও কোনোমতে দৌড়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম। লেপ গায়ে দিয়ে চিৎকার শুরু করলাম, ‘চৌকিদার! চৌকিদার!’
চিৎকার করতে করতে হঠাৎ মনে হলো, বাংলোর বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক মানুষের কথাবার্তার শব্দ আসছে।
কিন্তু কথাগুলো স্পষ্ট নয়। অচেনা। বোধগম্য নয়।
রাত ৩টার দিকে দুই চৌকিদার মাইকেল আর লিজ এসে পৌঁছাল। তারা জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, কী হইছে?’
আমি তাদের সব বললাম। তারপর আমরা একসঙ্গে গেস্টরুমে গেলাম। দরজা খুলতেই দেখি, ঘরের অবস্থা এলোমেলো। বিছানা, খাট, জিনিসপত্র উল্টাপাল্টা। আর মেঝে জুড়ে সাবানের ফেনা। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
লিজ তখন বলল, ‘স্যার, আপনি জানেন না। বছরে একবার এই বামন আসে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাহলে কী করতে হয়?’
সে বলল, ‘গেস্টরুমে ফল আর মিষ্টি রেখে দিতে হয়।’
সেই ঘটনার পর থেকে আমার আর সেখানে থাকতে ভালো লাগত না। প্রায়ই ঘুমের মধ্যে মনে হতো, কেউ যেন আমাকে বলছে, ‘এটা আমাদের। তুই চলে যা।’
শেষ পর্যন্ত সত্যিই আমি ওই বাগান ছেড়ে চলে আসি।
আঁকা : সোহানুর রহমান




