বানের রাতে

আঁকা : সোহানুর রহমান
বহু বছর আগের কথা। সেবার ভয়াবহ এক বন্যায় গোটা জনপদ পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। আমাদের গ্রামটি ছিল উপজেলা সদর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে। গ্রামের তিন দিক দিয়েই ছিল অন্য তিন উপজেলার শেষ সীমানা— যেদিকেই পা বাড়ানো হোক না কেন, আট-দশ কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
বন্যার পানি ক্রমেই বাড়তে বাড়তে একসময় ঘরের ভিটে পর্যন্ত ছুঁয়ে ফেলল। আমার মেজো ভাই তখন বাড়িতেই ছিলেন। মা তাকে ডেকে বললেন, ‘ঢাকায় তোর আব্বুর কাছে যা। পানি যেভাবে বাড়ছে, পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। কিছু টাকা-পয়সা আর বাজারসদাই করে নিয়ে আয়।’
বাজারের শেষ মাথায় কালভার্টের নিচ থেকে তখন হাজীগঞ্জ বাজারের উদ্দেশে ট্রলার ছাড়ত। সেখান থেকে চাঁদপুর সদর, আর তারপর লঞ্চ টার্মিনাল হয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে হতো— এক দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা।
সকালে যখন ভাইয়া ঘর ছাড়লেন, অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছিল। আকাশ ঢেকে আছে ঘন কালো মেঘের চাদরে। বহু কষ্টে দুপুর নাগাদ তিনি ঢাকায় আব্বুর কাছে পৌঁছালেন। আব্বু তাকে কিছু টাকা ও ফলমূল কিনে দিয়ে খাইয়ে দ্রুত লঞ্চে তুলে দিলেন। লঞ্চ যখন চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনালে পৌঁছাল, তখন প্রায় সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই। কিন্তু প্রবল বৃষ্টি আর ঘন অন্ধকারে দিন-রাতের কোনো ফারাক বোঝা যাচ্ছিল না। রাত সাতটা-আটটার দিকে যখন বৃষ্টি কিছুটা কমল, ভাইয়া বাসে করে হাজীগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন।
তখন বড় মার্কেট বা দোকানপাট ছিল না, চারপাশ ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে তিনি সেই ঘাটটিতে পৌঁছালেন, যেখান থেকে ট্রলার ছাড়ে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন, শেষ ট্রলারটি দেড় ঘণ্টা আগেই ছেড়ে চলে গেছে। স্থানীয় কয়েকজন মাঝি ঘাটে বসা ছিল, তবে তারা দূরপাল্লায় যেতে রাজি হচ্ছিল না। হঠাৎ এক লোক রাজি হলো। লোকটির মাথা গামছায় পেঁচানো থাকায় মুখটা ঠিকমতো ঠাওর করা যাচ্ছিল না। ভাইয়া দ্রুত নৌকায় উঠে বসলেন। চারপাশের ধানক্ষেতগুলো বন্যার পানিতে একাকার হয়ে সমুদ্রের মতো বিশাল রূপ নিয়েছিল।
নৌকা চলছে তো চলছেই। তিন ভাগের এক ভাগ পথ পেরোতেই ভাইয়ার খেয়াল হলো, মাঝির মুখ থেকে এক অদ্ভুত, অস্বাভাবিক গরগর শব্দ বের হচ্ছে। ভয় পেয়ে ভাইয়া কথা বলতে গেলেও মাঝি টুঁ শব্দও করল না। ভাইয়া আরও লক্ষ করলেন, মাঝি গ্রামের চেনা পথ ছেড়ে অন্য একটা অচেনা অন্ধকার পথের দিকে নৌকা ঘুরিয়ে দিচ্ছে। ভাইয়া আঁতকে উঠে চিৎকার করে উঠলেন, ‘একি! কোন দিকে নিচ্ছেন?’
মাঝি শীতল গলায় শুধু বলল, ‘আমি আর যাব না। এখানেই নামতে হবে।’ তারপর আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মাঝপথের একটা বড় গাছের গোড়ায় ভাইয়াকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়েই নামিয়ে দিল সে। তারপর নৌকা ঘুরিয়ে নিমেষেই অন্ধকারের গভীরে হারিয়ে গেল।
হতভম্ব ভাইয়া ভাবলেন, এই বর্ষার রাতে গাছের নিচে থাকা মানে সাপের মুখে জীবন সঁপে দেওয়া। এমন সময় আকাশে একঝলক বিদ্যুৎ চমকাল। সেই আলোয় দেখলেন, সামনেই একটা মাটির রাস্তা চলে গেছে সোজা। দুই পাশে অথৈ পানির বিশাল জলরাশি। রাস্তাটা ভাইয়ার কিছুটা চেনা, কারণ অতীতে সাইকেল নিয়ে এ পথেই যাতায়াত করেছেন।
লাশের একটি হাত ঝুলতে ঝুলতে ঠিক ভাইয়ার হাতের চামড়া ছুঁয়ে গেছে
ভাইয়া এক পা-এক পা করে পানিতে আধডুবা সেই মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। দূরে কোথাও টিমটিম করে জ্বলা গ্রামের দু-একটা আলোর শিখা ছাড়া চারপাশটা ভুতুড়ে নীরব। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে হঠাৎ তার কানে এলো, ‘ছলাৎ ছলাৎ’ জলের শব্দ।
পেছন ফিরে তাকাতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। দূরে একটা নৌকা এগিয়ে আসছে। একটু কাছে আসতেই তিনি পরিষ্কার দেখতে পেলেন— এটি সাধারণ কোনো নৌকা নয়, একটি লাশবাহী নৌকা! কারণ তখনকার দিনে লাশবাহী নৌকার সামনে ছোট একটি পতাকা বা বিশেষ নিশানা ঝুলিয়ে দেওয়া হতো।
ভয়কে জয় করে জীবন বাঁচাতে ভাইয়া চিৎকার করে উঠলেন, ‘আমাকে একটু তুলে নিন!’নৌকার ছৈইয়ের ভেতর থেকে কয়েকজন লোক উঁকি দিয়ে তাকে দেখে নৌকায় তুলে নিল। ভাইয়া নৌকার ভেতরে ঢুকে দেখলেন, ঠিক মাঝখানে কাফনের কাপড়ে মোড়ানো একটি লাশ শোয়ানো, চারপাশে কয়েকজন শোকার্ত মানুষ বসা আর পেছনে মাঝি।
তাদের একজন জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাবেন?’
ভাইয়া কাঁপা কাঁপা গলায় গ্রামের নাম বললেন। তারা জানাল, তারাও সেই পথেই যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় নৌকার লোকজন তাকে ছৈইয়ের ভেতরে গিয়ে লাশের ঠিক মাথার কাছে বসতে বলল। শরীর তখন চরম ক্লান্ত। বসতেই চোখের পাতা দুটি ভারী হয়ে এলো, আচ্ছন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি। হঠাৎ হাতের তালুতে বরফশীতল কিছু একটা ছোঁয়া লাগতেই তার ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে যা দেখলেন, তাতে তার আত্মা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো! নৌকার ভেতরে কেউ নেই। সেই লোকজন নেই, মাঝি নেই। শুধু লাশটি ঠিক আগের মতো শোয়ানো আর সেই লাশেরই একটি হাত ঝুলতে ঝুলতে ঠিক ভাইয়ার হাতের চামড়া ছুঁয়ে গেছে! এতটাই ঠান্ডা সেই স্পর্শ! শুধু তা-ই নয়, ভাইয়ার মনে হলো লাশটার হাতটা যেন আস্তে করে নড়ছে!
বিকট এক চিৎকারে ভাইয়া নৌকা থেকে সোজা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং সাঁতরে কূলে এসে উঠলেন। কূলের কাঁচা রাস্তা ধরে কিছুটা সামনে আসতেই তার ভয় আরও বহুগুণ বেড়ে গেল। এটি সেই গোরস্তান, যেখানে দূরের অজানা লাশগুলো এনে দাফন করা হতো। ভয়ে ভয়ে পা টিপে টিপে এগোতে গিয়ে হঠাৎ তার একটা পা মাটির নিচে দেবে গেল। কোনো এক পচে যাওয়া পুরনো কবরের গভীরে ঢুকে গেছে তার পা! কোনোভাবেই পা তুলতে পারছেন না তিনি আর ঠিক আগের মতো সেই শীতল বরফের মতো কিছু একটা তার পা আঁকড়ে ধরছে!
চিৎকার করতে করতে কোনোমতে জোর করে পা টেনে তিনি সামনে এলেন। কিছুটা দূরে একটা বাড়ি থেকে টর্চের ক্ষীণ আলো দেখতে পেয়ে প্রাণপণে চিৎকার শুরু করলেন। সেই আওয়াজ শুনে স্থানীয় কয়েকজন লোক টর্চ নিয়ে বেরিয়ে এলো এবং তাকে উদ্ধার করল। কাকতালীয়ভাবে, তাদেরই একজন আমাদের দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের পরিচিত। তারা একটি বড় নৌকা এনে সেই রাতেই ভাইয়াকে অক্ষত শরীরে বাড়িতে পৌঁছে দিল।




