পাঠকের ভয়
বন্ধ দরজার ওপারে

আঁকা : সোহানুর রহমান
ঘটনাটি আমার এক খালার কাছে শোনা। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগের ঘটনা। তৎকালীন কুমিল্লা জেলার হাজীগঞ্জ থানার টোরাগড় এলাকায় আমার নানাবাড়ি। বিভিন্ন ধরনের গাছ ও ঝোপ-জঙ্গলে ভরা ছিল নানাবাড়ির চারপাশ। আমার নানা ছিলেন ডাক্তার। বাড়ির ভেতরে ঢোকার মেইন গেটের সঙ্গেই তার চেম্বার। অনেক সময় বাড়ির দরজাটা বন্ধ থাকলে চেম্বার দিয়ে ঢুকতে হতো সবাইকে। খালা তখন স্কুলে পড়েন। খালারা দুই বোন একসঙ্গে বাসায় ফিরতেন। একদিন দুপুরে বাড়ির সামনে এসে তারা দেখেন দরজা বন্ধ। চেম্বারের দরজাটাও বন্ধ দেখতে পেয়ে উঁকি মারলেন জানালার কাছে গিয়ে।
দেখতে পেলেন ভেতরে একজন লোক বসা রয়েছেন, পরনে সাদা কাপড়।
খালারা তখন দরজা খোলার জনা লোকটিকে অনুরোধ করলেন। কিন্তু তিনি কোনো কথা বললেন না। কঠিন চোখে তাকালেন তাদের দিকে। ওই সময় এক খালার চোখ আটকে গেল চেম্বারের দরজার দিকে। তিনি দেখতে পেলেন বাইরে থেকে তালা দেওয়া রয়েছে।
‘তাহলে কি ওই লোককে ভেতরে রেখে বাইরে থেকে তালা দিয়ে গেছেন বাবা’— মনে মনে ভাবলেন খালা। আর ঠিক ওই সময় খুলে গেল বাড়িতে ঢোকার প্রধান দরজাটি। দুজন এক ছুটে ঢুকে পড়লেন ভেতরে। হাঁপাতে হাঁপাতে মাকে বললেন ঘটনাটি। নানিও সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলেন চেম্বারের কাছে। বাড়ির ভেতর থেকে চেম্বারে ঢোকার দরজাটা ভেতর থেকেই বন্ধ ছিল। এরপর বাইরের দিকে এসে নানিও দেখলেন চেম্বারে ঢোকার দরজায় তালা লাগানো। তখন জানালার কাছে গিয়ে তারা উঁকি মারলেন ভেতরে। কিন্তু সেখানে কোনো মানুষ দেখা গেল না। আমার নানা-নানি কেউ এখন জীবিত নেই। তবে দুই খালা বেঁচে আছেন। ঘটনাটি আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও খালা বলেছেন, ওই ঘটনার কিছু সময় পর বাসায় ফিরে এসেছিলেন নানা। তবে তিনি কোনো লোককে ভেতরে রেখে বাইরে থেকে তালা দিয়ে যাননি।
এর কিছুদিন পর বাড়ির কাছের একটি মাঠে খেলতে যান আমার খালারা। মাঠটির পেছনের দিকে ছিল বেশ কয়েকটি বড় বড় তালগাছ। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে তারা খেয়াল করেন একটি তালগাছের ওপর থেকে ভেসে আসছে মানুষের গোঙানির শব্দ। সেখানে গিয়ে দেখতে পান গাছের মাথায় বসে আছে একটি লোক। তার পরনে শুধু লুঙ্গি। গাছটির আরও কাছে যেতেই খালাদের চোখ ছানাবড়া। লোকটি আর কেউ নয়, বাড়ির কাজের লোক আরব আলি।
খালারা তাকে নেমে আসার জন্য বললেও তিনি ওপরে বসেই অদ্ভুত আওয়াজ করতে থাকেন। কখনো অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন। ভয় পেয়ে খালারা বাড়ির পথে দৌড় শুরু করেন। সেই মাঠ থেকে শুরু করা খালাদের দৌড়টা যেন শেষ হয় বাড়ির মেইন গেটের সামনে এসে। আর তখনই স্তব্ধ হয়ে যান তারা। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আরব আলি।




