জানালার ওপাশে

সংগৃহীত ছবি
আষাঢ়ের রাত। কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। কখনো মুষলধারে, কখনো ঝিরিঝিরি। রাত আড়াইটার দিকে হঠাৎ ঘুম ভাঙার পর মনে হলো আজ তো মেডিটেশন করিনি। সাধারণত রাত ১১টার দিকে নিয়মিত মেডিটেশন করে ঘুমাতে যাই আমি। ভাবলাম, যেহেতু ঘুম ভেঙেছে তাহলে মেডিটেশনটা করে নিই। পড়ার টেবিলের কাছ থেকে চেয়ারটা টেনে জানালার কাছে নিলাম।
দ্বিতল ভবনের উত্তর-পূর্ব দিকে আমার রুম। দুটি জানালা। একটি উত্তর দিকে। অন্যটি পূর্ব দিকে। আমি সাধারণত পূর্ব দিকের জানালার কাছে বসে মেডিটেশন করি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে চোখে পড়ে বড় একটি ঝিল। বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ জন্মায় সেখানে। ঝিলের দক্ষিণ দিকে বানিয়াচং উপজেলা পরিষদের বাউন্ডারি ওয়াল। পূর্ব দিকের ঝোপ-জঙ্গলে শিয়ালের আড্ডা। উত্তর দিকেও ঝোপঝাড় এবং পুরাতন একটি পুকুর। ঝিলের পশ্চিম দিকে অর্থাৎ আমার রুমের জানালা বরাবর তিনটি মাঝারি আকারের ইউক্যালিপটাস গাছ আছে।
মেডিটেশনের উদ্দেশ্যে চেয়ারে বসামাত্রই খোলা জানালা পথে হালকা গরম হাওয়া বয়ে গেল আমার শরীর জুড়ে। অবাক হয়ে ভাবলাম, কয়েক দিন অনবরত বৃষ্টির কারণে আবহাওয়া এমনিতেই ঠান্ডা। এর মাঝেও হঠাৎ এমন গরম হাওয়া এলো কোনখান থেকে।
উঠে দাঁড়ালাম। উপজেলা পরিষদের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমি ভালো করে জানালা দিয়ে এদিক-ওদিক তাকালাম। নাহ, কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মেডিটেশনের জন্য চোখ বন্ধ করার পর টের পেলাম ইউক্যালিপটাস গাছগুলো বিকট শব্দ করে একসঙ্গে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। অবাক হয়ে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখি গাছগুলো প্রচণ্ড বাতাস হলে যেভাবে হেলেদুলে নড়ে, ঠিক তেমনভাবেই নড়ছে। অন্য কোনো গাছপালা একদমই নড়ছে না! কিছুটা ভয় হলো এবার। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকালাম। রুমে ডিমলাইট জ্বলছে। ওখান থেকে উঠে এসে উত্তর দিকের জানালাটি বন্ধ করার জন্য বিছানায় উঠলাম। জানালার গ্লাসে হাত দিতেই বেশ গরম লাগল। অস্বস্তি ঝেড়ে, জানালা যখন বন্ধ করব ঠিক তখনই দেখলাম বাইরে বিশাল লম্বা এক কালো ছায়া! অন্ধকারের বুক চিড়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। হাত দুটি গাছের ডালের মতো শুকনো। মুখ লম্বা এবং চোখ দুটি কয়লার অঙ্গারের মতো জ্বলছে। যেন হাওয়ায় ভেসে আসছিল আমার দিকে! সঙ্গে বিশাল দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। আমি দ্রুত জানালা বন্ধ করে পর্দা টেনে বিছানায় বসলাম। জানালার গ্লাস লক করার সুযোগ পাইনি। বুক ধড়ফড় করতে লাগল। এমন সময় বিদ্যুৎ চলে গেল। রুম একেবারে অন্ধকার।
মোবাইল ড্রয়িংরুমে চার্জ দেওয়া। ভয়ে ভয়ে বিছানা থেকে উঠে জানালা দিকে তাকালাম পূর্ব দিকে। গাছগুলোর ডালপালা কিছুটা নড়ছে এখনো। এবার ঠান্ডা বাতাস ঢুকল রুমে। সাহস সঞ্চয় করে জানালার কাছে গেলাম। আর তখনই অদ্ভুত কালো ছায়াটা ভয়ংকর ভঙ্গিতে আমার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল! আমি কয়েকবার জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। এরপর আর কিছু বলতে পারিনি। পরদিন সকালে চোখ মেলে নিজেকে রুমের মেঝেতে আবিষ্কার করি। জানালাগুলো খোলা। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি।




