আয়নাল ফকিরের কবর

সংগৃহীত ছবি
আয়নাল ফকিরের নতুন কবরটার পাশ দিয়ে যেতে হবে শুনে বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে উঠল। ফকির মারা গেছেন মোটে তিন দিন। মারা যাওয়ার পর তার কবর ঘিরে কিছু অলৌকিক খবর বাতাসে ভাসছে। তখন আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে এসেছি। কয়েক দিন যেতে হাঁপিয়েও উঠেছি। গাঁয়ের বর্ষাকাল খুব একঘেয়ে হয়। সারা দিন বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই। বাড়িতে আমার সমবয়সী তেমন কেউ নেই। বিদ্যুতের অভাবে সন্ধ্যার পর চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যায়।
আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে এক দূরসম্পর্কের চাচার বাড়ি। আমরা বলি ‘শিকদারবাড়ি’! বাড়িভর্তি আমার বয়সী ছেলেপুলে।
বৃষ্টির ভেতর ফুটবল খেলা, পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা, রাতে বাগান থেকে ডাব পাড়া, নানা রোমাঞ্চকর কাজে শিকদারবাড়ির ছেলেরা বেশ পারদর্শী!
দাদির কাছে অনুমতি নিয়ে এক সকালে তাই শিকদারবাড়ি চলে গেলাম। সমবয়সী ভাইদের সঙ্গে খেলাধুলা আর গালগপ্পে কখন যে সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে, টের পাইনি। বাড়ি ফেরা নিয়ে চিন্তা হচ্ছিল। চাচাতো ভাই জয় সাহসী ছেলে। সে তিন ব্যাটারির একটি টর্চ বের করে বলল, ‘চল ইমন, তোকে বাড়ি দিয়ে আসি!’
খালের পাড় ধরে ইটের রাস্তা চলে গেছে আমাদের বাড়ির ‘কাচারি’ পর্যন্ত। বাড়ির কাছে এসে একটা কাঠের সাঁকো পেরোতে হয়। আয়নাল ফকিরকে কবর দেওয়া হয়েছে ওই সাঁকোর নিচে খালের পাড়ে। ওই সাঁকোটা পার হতে পারলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে।
দুই ভাই টর্চের আলোয় গল্প করতে করতে হাঁটছি। যদিও দুজনের মাথার ভেতরেই আয়নাল ফকিরের কবর। সন্ধ্যার পর বৃষ্টি নেই। কিন্তু চারপাশটা কেমন গুমোট অন্ধকার হয়ে আছে। শব্দ বলতে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ঐকতান।
অনেকখানি হাঁটার পর টের পেলাম ‘কাচারি’র সাঁকোর কাছে এসে পড়েছি। দূরে ফকিরের কবর আবছায়া দেখা যায়। বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে আসছে।
হঠাৎ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। জয়ের টর্চটা ‘দুপ’ করে বন্ধ হয়ে গেল! কোনোভাবে ওটাকে আর জ্বালানো গেল না। ঠিক এ সময় ফকিরের কবরের ওপর একটা হালকা বেগুনি আলো জ্বলছে, দেখলাম।
ধীরে ধীরে আলোটা বড় হচ্ছিল। আলোটা এত উজ্জ্বল হলো যে নতুন কবরের চারপাশে ইট দিয়ে ঢাকা নীল পলিথিনটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। অপার্থিব নীল আলোটা দুলতে দুলতে সোজা আমাদের দিকে এগিয়ে এলো!
জয়ের হাত থেকে টর্চটা পড়ে গেছে তখন। দুজনে সর্বশক্তিতে দৌড়িয়ে সাঁকো পেরিয়ে বাড়িতে এসে উঠলাম। জয়কে ওই রাতে আর বাড়ি যেতে দেওয়া হলো না!




