বৃষ্টিতে যে দাঁড়িয়ে ছিল

আঁকা : ফারজিন
সেদিন রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে বাস দেরিতে পৌঁছায়। আমি আর আমার মামা নেমেই বুঝলাম, বিপদে পড়েছি। বাসস্ট্যান্ড প্রায় জনশূন্য। কোনো রিকশা নেই, ভ্যান নেই, এমনকি পথচারীও নয়। আমাদের গ্রামে পৌঁছাতে সামনে কয়েক কিলোমিটার পথ। অপেক্ষা করলে ভোর হবে, তাই বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটা শুরু করলাম।
রাস্তাটির একপাশে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, অন্যপাশে পুরনো গাছের সারি। বৃষ্টির ফোঁটা কাদায় পড়ে এক অদ্ভুত শব্দ তুলছিল। মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের ঝলক চারদিক আলোকিত করে আবার মুহূর্তেই সব গিলে নিচ্ছিল ঘন অন্ধকার।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হলো, আমরা দুজন নই, আরও কেউ আছে।
পেছনে তাকালাম। কিন্তু কাউকে দেখা গেল না।
কিছুদূর এগোতেই মামা আমার কনুই শক্ত করে চেপে ধরলেন। কাঁপা গলায় বললেন, ‘ওদিকে তাকাও।’
রাস্তার বাঁপাশে, ধানক্ষেতের কিনারায়, বৃষ্টির ভেতর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে সাদা কাপড়ে মোড়া অস্বাভাবিক লম্বা একটি অবয়ব। মুখ বোঝা যায় না। বৃষ্টি তার শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে, অথচ কাপড়ের একটি ভাঁজও নড়ছে না।
আমরা স্থির হয়ে গেলাম। তারপর সাহস সঞ্চয় করে হাঁটতে শুরু করলাম। যত এগোচ্ছি, অবয়বটি তত স্পষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছিল, সে আমাদেরই দেখছে। হঠাৎ বাতাস সম্পূর্ণ থেমে গেল। বৃষ্টির শব্দও যেন দূরে সরে গেল।
হঠাৎ বিকট বজ্রপাত। চোখধাঁধানো আলোয় একমুহূর্তের জন্য অবয়বটির মুখ দেখা গেল। সেটা মানুষের হতে পারে না। অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে, দুটি চোখ যেন অন্ধকারের মধ্যেই জ্বলছিল। আমার শরীর অবশ হয়ে গেল। পরের মুহূর্তেই আলো নিভে গেল। আবার যখন সামনে তাকালাম, সেখানে কেউ নেই। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো ভেজা কাপড় টেনে হাঁটার মতো ক্ষীণ শব্দ। আমরা একসঙ্গে ফিরে তাকালাম। অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা গেল না। আর একমুহূর্তও দাঁড়াইনি। প্রায় দৌড়ে বাড়ি পৌঁছেছিলাম। সেদিন রাতের পর বহুদিন আমরা সেই পথ এড়িয়ে চলেছি। ঘটনাটি নিয়ে যতবার আলোচনা করেছি, ততবারই মনে হয়েছে আমাদের দুজনের একই বিভ্রম দেখার কথা নয়।
একদিন স্থানীয় এক বৃদ্ধের মুখে শুনেছিলাম, বর্ষার এমন গভীর রাতে ওই পথটিতে নাকি মাঝেমধ্যে সাদা কাপড় পরা এক নারীর ছায়া দেখা যায়। কেউ তার কাছে পৌঁছাতে পারে না; যতই এগোয়, সে ততই দূরে সরে যায়। গ্রামের মানুষ সূর্য ডোবার পর সেই পথ এড়িয়ে চলে। তখন সেই গল্প বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এখন...




