চা বাগানের অশরীরী
ডেডলি সাহেবের বাংলো ও মোরগ সমাচার

আঁকা : নওরিন জাহান শর্মী
সত্তর বা আশির দশকের দিনগুলোতে চা বাগানের ম্যানেজার বা সহকারী ব্যবস্থাপকদের জীবন কাটত চরম রোমাঞ্চ আর অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তেমনই দুটি সত্য ও শিহরনজাগানো ঘটনার রোমাঞ্চকর বিবরণ দিয়েছেন কুমারশাইল চা বাগানের ম্যানেজার সজল ইবাদ
মাঝরাতের মেহমান
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। তখন আমি মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার টেংরাবাজার ইউনিয়নের অধীন শাকেরা চা বাগানে (যার বর্তমান নাম মাথিউরা টি এস্টেট) কর্মরত। বাগানের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল ব্রিটিশ আমলের দোতলা বাংলো। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এক কড়া মেজাজের ইংরেজ সাহেব, যাকে স্থানীয়রা বলত ‘ডেডলি সাহেব’। অনেক পরে সেই সাহেবের নাতি এসে বাংলোর পুরনো কিছু ছবি আমার কাছে দিয়ে গিয়েছিলেন।
বাংলোর স্থাপত্য ছিল বেশ অদ্ভুত। দোতলা এই বিশাল বাংলোর ওপরতলাটিকে বলা হতো ‘উইন্টার বাংলো’, কারণ সেখানে শীতের প্রকোপ কম আর গরমের আমেজ বেশি থাকত। অন্যদিকে, গরমকালে নিচে শীতল পরিবেশে থাকার ব্যবস্থা ছিল। ডাইনিং রুমটি ছিল রাজকীয়— মাঝখানে প্রায় ১৫ হাত লম্বা একটি বিশাল কাঠের ডাইনিং টেবিল।
ঘটনাটি ঘটেছিল এক গভীর রাতে। শ্রীমঙ্গল থেকে গাড়ি চালিয়ে রাতে বাংলোতে ফিরলাম, তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত একটা কি দেড়টা। আসার আগে আমি বাগানের বাবুর্চি মধুকে বলে গিয়েছিলাম খাবার গরম করে ডাইনিং টেবিলে ঢেকে রাখতে।
রাত ১টা ২০ মিনিটে গাড়ি থেকে নেমে আমি সরাসরি চলে গেলাম ডাইনিং রুমে। কিন্তু টেবিলে গিয়ে তো আমার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! খাবার ঢাকা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু থালার ভাত সম্পূর্ণ হাওয়া! মাছের কাঁটা, মাংসের হাড়গোড় সব চিবিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রথম মনে হলো, হয়তো কোনো বিড়াল বা ইঁদুর খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু নিজেকে বোঝালেও খটকা গেল না।
আমি সঙ্গে সঙ্গে ডাকলাম— ‘মধু! ও মধু!’
ঘুমচোখে ছুটে এলো মধু। আমি মেজাজ হারিয়ে বললাম, ‘আমার খাবার কোথায়? তুই এগুলো কী করলি?’
মধু থরথর করে কেঁপে উঠে বলল, ‘স্যার, আমি তো কিছুই জানি না! আপনি তো একটু আগেই খেয়ে গেলেন!’
‘আমি খেয়ে গেছি মানে? তুই মদ খেয়েছিস নাকি?’
মধু মুসলমান বাবুর্চি, সে আতঙ্কিত হয়ে হাতজোড় করে বলল, ‘স্যার, গালের মধ্যে থাপ্পড় মারেন, আমি এসব মুখে দিই না। আপনি নিজেই তো খেয়ে গেছেন একটু আগে!’
কথার রেশ শেষ না হতেই ‘ধাম’ করে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল মধু, ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে!
হইচই শুনে চারপাশ থেকে চৌকিদার ও বাগানকর্মীরা ছুটে এলো। জ্ঞান ফেরার পর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মধু চাঞ্চল্যকর যে তথ্যটি দিল, তা শুনে আমার গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেল। মধু জানাল, ঠিক আধঘণ্টা আগে হুবহু আমার মতো দেখতে, মুখে বড় মোচওয়ালা এক লোক এসে তার কাছে ভাত চেয়েছিল। সে গরম ভাত বেড়ে দেওয়ায় সেই লোক গোগ্রাসে তা খেয়ে চলে গেছে!
কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে গভীর রাতে ভারী জুতার শব্দ আসত, কিন্তু ওপরে গিয়ে কাউকে পাওয়া যেত না
এ ঘটনার পর ওই বাংলোয় থাকা আমার জন্য একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে গভীর রাতে ভারী জুতোর শব্দ আসত, কিন্তু ওপরে গিয়ে কাউকে পাওয়া যেত না। কখনোবা ভেসে আসত ঘুঙুরের রিনঝিন শব্দ কিংবা কোনো শিশুর কান্নার আওয়াজ। মসজিদের হুজুরকে ডেকে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম চার কোনায় আরবি তাবিজ দিয়ে ঘর ‘বাঁধানো’ হলেও কোনো লাভ হয়নি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, ব্রিটিশ আমলে এই বাংলোর এক ইংরেজ সাহেবের প্রেয়সী বা কন্যা ছাদের বড় কাঠের বরগায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। সে যুগে পালের জাহাজ বা স্টিমারে যাতায়াত করতে ছয় মাস সময় লাগত বলে ম্যানেজারদের দীর্ঘ ছুটি দেওয়া হতো; আর সেই নিঃসঙ্গতা ও প্রেমের ট্র্যাজেডিই হয়তো এই বাংলোয় অমর হয়েছিল সেই অশরীরী আতঙ্কে।
দানবীয় মোরগ
বছর কয়েক পরের কথা, ১৯৮৮ সালের ১ নভেম্বর। আমি তখন যোগ দিয়েছি মণিপুর চা বাগানে (তৎকালীন নাম মৌরাপুর টি এস্টেট)। ফেঞ্চুগঞ্জ ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরির একেবারে পাশেই ছিল এর অবস্থান। মৌরাপুর ছিল মূল বাগানের একটি আউটগার্ডেন বা শাখা অংশ।
সেখানে ব্রিটিশ সাহেবদের একটি পুরনো সংরক্ষিত সিমেট্রি বা সমাধিক্ষেত্র ছিল, যেখানে এপিটাফে খোদাই করা ছিল মর্মান্তিক এক ইতিহাস— একই দিনে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে এক ইংরেজ সাহেব, তার স্ত্রীসহ মোট পাঁচজন মারা গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে ২০০০ সালের দিকে উত্তরবঙ্গে বদলি হয়ে যাওয়ার পর আমি জানতে পারি যে, সেই ঐতিহাসিক কবরস্থানটি বা এপিটাফগুলো চুরি হয়ে গেছে।
ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৮৯ সালের এক শীতের শেষের বিকাল বা সন্ধ্যায়। আমি তখন বাগানে কীটনাশক ছিটানোর (স্প্রে) তদারকি করছিলাম। মৌরাপুরের পাশ দিয়েই চলে গেছে ঢাকা-সিলেট রেললাইন আর একটু দূরেই মাইজগাঁও রেলওয়ে স্টেশন। আমাদের কাজের সেকশন নম্বর ছিল ২৫।
কাজ শেষ করতে করতে সন্ধ্যা নেমে এলো। আমার সঙ্গে থাকা সব লেবার ও কর্মী আগেই চলে গিয়েছিল। কিন্তু আমার ভেতর তখন অদ্ভুত এক সাহসিকতা ভর করেছিল। আমি একা একা রেললাইনের ধার দিয়ে হেঁটে আসছিলাম আর গুনগুন করে গাইছিলাম প্রিয় সব গান— কখনো কান্ট্রি রোড, আবার কখনো বনি এম-এর বিখ্যাত পপ গান— ‘Ra Ra Rasputin, Russia’s greatest love machine...’
হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছালাম স্থানীয় একটি হিন্দু সম্প্রদায়ের শীতলা দেবীর মন্দিরের সামনে। সেখানে ছিল একটি বিশাল প্রাচীন বটগাছ। ঠিক তখনই ঘটল সেই অবাস্তব ও পিলে চমকানো ঘটনা।
হঠাৎ করেই দেখলাম, রাস্তার পাশে বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে একটি অস্বাভাবিক বিশাল আকৃতির মোরগ! আকৃতিতে সেটি আমার নিজের মাথার সমান (আমার উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি)। বুনো মোরগ আগে দেখলেও এতবড় মোরগ আমার কল্পনারও অতীত ছিল। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় ছিল, সেই মোরগের ঠোঁটটিই ছিল অস্বাভাবিক লম্বা এবং তার মাথার ঝুঁটিটি ছিল দানবাকৃতির। আর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দৃশ্য— তার ঠোঁট দিয়ে ফিনকি দিয়ে যেন আগুন বের হচ্ছিল!
আমার সংগীতের সুর গলাতেই আটকে গেল। থমকে দাঁড়িয়ে ভাবলাম, এটি কি কোনো বিভ্রম? এই বিশ্রী দানবীয় মোরগ যদি এক্ষুনি তেড়ে এসে আমাকে ঠোকর মারে, তবে আর রক্ষা নেই। প্রাণপণে আমি তখন চারপাশের লাইন চৌকিদারদের ডাকতে লাগলাম— ‘মাখন! রবিয়া! ও মাখন! রবিয়া!’
কিন্তু কেউ সাড়া দিল না, ঘড়িতে তখন রাত প্রায় আটটা। দানবীয় মোরগটি একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, একচুলও নড়ছে না। আমার বুক তখন কাঁপছে থরথর করে।
ঠিক পরের মুহূর্তে যা ঘটল, তা কোনো মানুষের কল্পনার বাইরে। মোরগটি মাটিতে না দৌড়ে সরাসরি বিকট ডানা ঝাপটানোর শব্দ তুলে আকাশে উড়াল দিল!
সেই ভয়ংকর দৃশ্য দেখার পর আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি— তৎক্ষণাৎ জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ি।
জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে আবিষ্কার করি মণিপুর চা বাগানের ডিসপেনসারিতে (হাসপাতাল)। চিকিৎসকরা ও সহকর্মীরা আমাকে ঘিরে ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘স্যার, আপনার কী হয়েছিল?’ আমি যখন পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলাম, তখন সবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। স্থানীয়রা একবাক্যে স্বীকার করল, ওই শীতলা স্থান ও বটগাছের আশপাশে কোনো অশুভ ছায়া বা অপার্থিব শক্তির বসবাস রয়েছে। তারা বলল, ‘স্যার, আপনি প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, এটাই অনেক!’






