মরণখেলা

যখন ঘন মেঘে ঢেকে গিয়েছিল আকাশ। ছবি: অপু নজরুল
একসময় আমার আলো দিয়ে মাছ মারার খুব নেশা ছিল। বর্ষাকালে যখন ঝুম বৃষ্টি হয়, তখন বিশেষ করে বিলের মাছ বাইরে বেরিয়ে আসে, অর্থাৎ ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়ে। তখন টর্চের আলোতে টেঁটা বা কোচ দিয়ে এদের শিকার করা হয়। এভাবে মাছ মারতে গিয়ে নানান অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। যেই গল্পটা বলতে চাচ্ছি, সেটা প্রায় ৩০ বছর আগের।
এক সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টি হলো। বৃষ্টির পর আমি তিন ব্যাটারির টর্চ এবং টেঁটা হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম, তখন রাত ১০টা। এভাবে আলো দিয়ে মাছ মারতে গিয়ে মানুষের বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়। কেউ বলে মেছো ভূতের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কেউ কেউ আলোয়ার দেখা পায়। আবার একজন মানুষ একটা শোল মাছকে টেঁটা দিয়ে আঘাত করে, পরে দেখে শোল মাছটা একটা মানব শিশু হয়ে গেছে। সেই লোকটাও পরে মারা যায়।
এসবে কান দেওয়ার সময় তখন আমার ছিল না। আমার লক্ষ্য ছিল তিনটে বিল— বাঘবের, দুয়াই আর ডুমরি। এর মধ্যে ‘বাঘবের’ বিলটি ছিল বুনো ও ভয়ংকর; প্রবীণদের মুখে শুনতাম, একসময় নাকি বাঘ আসত সেই বিলের পাড়ে জল খেতে। সেদিন কোনো চাঁদ ছিল না আকাশে, ছিল গভীর অন্ধকার আর টিপটিপ বৃষ্টি। দুয়াই বিল ঘুরে যখন বাঘবের বিলের কাছাকাছি পৌঁছলাম, তখন হঠাৎ একটা ধানক্ষেতের ভেতর তীব্র আলোড়ন শুনতে পেলাম। টর্চ ফেলার পর সেখানে একটা বড়সড় শোল মাছ পেলাম। পূর্ণিমা রাতে যদি আকাশে চাঁদ থাকত, তাহলে কিন্তু মাছগুলো তেমন একটা কিনারায় আসত না। কিন্তু অন্ধকার রাতে আলো ফেললে মাছগুলো কিনারায় আসত।
রাস্তার দুপাশেই ক্ষেত যেগুলো আছে সেগুলোতে টর্চের আলো ফেললাম। তখনই তাকে দেখতে পেলাম। শাখিনী সাপ। ইংরেজিতে যাকে বলে ব্যান্ডেড ক্রেট এবং সে সম্ভবত একটা সাপকে ধরেছে খাওয়ার জন্য। শঙ্খিনী সাপখেকো। আমি ভাবলাম সে নিশ্চয়ই কোনো ঢোঁড়া সাপকে ধরেছে, কারণ ঢোঁড়া সাপই হচ্ছে তার প্রধান খাদ্য। কিন্তু দেখলাম প্রবল যুদ্ধ হচ্ছে। আরেকটু সামনে গিয়ে আমি তো হতবাক হয়ে গেলাম। দেখলাম যে শঙ্খিনী যাকে ধরেছে, সে ওয়ালস ক্রেট। ওয়ালস ক্রেট হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম বিষধর সাপ এবং আরেকটা মজার বিষয় হচ্ছে, ওয়ালস ক্রেটেরও কিন্তু প্রিয় খাদ্য অন্য সাপ। আমার অবাক লাগল, এক সাপখেকো আরেক সাপখেকোকে খাচ্ছে। তবে লড়াইটা বেশ জমে উঠেছে। কারণ, শঙ্খিনীটা প্রায় ছয় ফুটের মতো লম্বা। ওয়ালস ক্রেটও কম না, এ প্রায় পাঁচ ফুটের মতো লম্বা। প্রচলিতভাবে বাংলায় এই ওয়ালস ক্রেটের তেমন কোনো নাম নেই, আবার অনেকে একে রাজকেউটেও বলে থাকে। আর আমরা যে নরসিংদীর মানুষ, আমরা ওয়ালস ক্রেটকে সাধারণত কালাই নামে চিনি।
দৃশ্যটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাদের ধস্তাধস্তিতে চারপাশের ধানক্ষেত লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছিল। জল আর কাদার ছাঁট এসে পড়ছিল আমার গায়ে। সাপ দুটোর ফুসফুসের হিসহিস শব্দ আর পাতার মড়মড় আওয়াজে রাতের নীরবতা ভারী হয়ে উঠেছিল। আমি পাথরের মতো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম। একটু একটু করে শক্তি ফুরিয়ে এলো কালাইয়ের। শঙ্খিনীর সাঁড়াশি প্যাঁচের সামনে শেষ পর্যন্ত হার মানল সেই বিষধর দানব। কালাইয়ের শরীর যখন একেবারে নিস্তেজ হয়ে এলো, তখন বিজয়ী শঙ্খিনী তার শিকারকে আস্ত গিলে খাওয়া শুরু করল।
প্রকৃতির এই নির্মম ও আদিম খেলায় বাধা দেওয়ার ধৃষ্টতা আমার ছিল না। নিঃশব্দে পিছিয়ে এলাম আমি।




