সাগরতলে অন্যরকম ভ্রমণ!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সাগরের তলদেশে ভ্রমণের বিচিত্র এক অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন এলিজা বিনতে এলাহী
ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণে গায়ে ভিন্ন রকম পোশাক চাপিয়ে, অতিরিক্ত ওজন জড়িয়ে এবং শ্বাস চলাচলের জন্য মাথায় হেলমেট পরে পানির নিচে রঙিন মাছের সঙ্গে সময় কাটানো এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানে আক্ষরিক অর্থেই পানির নিচে হেঁটেছিলাম। তবে এবার কানাডা ভ্রমণের সময় সমুদ্রের তলদেশে হাঁটার অভিজ্ঞতাটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা এবং রোমাঞ্চকর। কানাডার নোভা স্কশিয়া প্রদেশের হ্যান্টস কাউন্টির নোয়েল শোর এলাকায় অবস্থিত বার্নকোট হেড পার্কে হয় এই বিরল অভিজ্ঞতা। ছেলেবেলার বন্ধু সেলিনার আমন্ত্রণে তার বন্ধুদের সঙ্গে সারা দিনের এই আনন্দযাত্রায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
পার্কে পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়ে সবুজ ঘাসে ঘেরা খোলা প্রান্তর, ছোট হাঁটার পথ এবং একটি ঐতিহাসিক বাতিঘর। বাতিঘরের ওপর থেকে চারপাশের দৃশ্য দারুণ উপভোগ্য; দূরে বিস্তৃত বে অব ফান্ডি, কাছাকাছি লালচে পাথুরে উপকূল এবং জোয়ারের অপেক্ষায় থাকা জলরেখা মিলে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে। তবে এখানকার মূল আকর্ষণ সেই সমুদ্রতল, যা কিছুক্ষণ আগেও পানির নিচে ছিল এবং কিছু সময় পর আবারও তলিয়ে যাবে।
পর্যটকের সুবিধার্থে পার্ক থেকে সমুদ্রের কাছাকাছি নামার জন্য সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে নামতেই মনে হয়, আমরা সমুদ্রের তীরে নয়, সরাসরি সমুদ্রের ভেতরে হাঁটছি। জোয়ারের সময় যেখানে ৪০ থেকে ৫০ ফুটের বেশি গভীর পানি থাকে, ভাটার সময় সেখানে পায়ের নিচে মেলে শুকনো, কাদামাটিময় ও পাথুরে ভূমি। সম্পূর্ণ শুকনো মাটিতে হেঁটে বেড়ানোর এই সুযোগ মেলে জোয়ার ও ভাটার মাঝখানের নিরাপদ ছয় ঘণ্টার জন্য।
হ্যালিফ্যাক্স শহর থেকে গাড়িতে দেড় ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই পার্ক বে অব ফান্ডির মিনাস বেসিন অংশে অবস্থিত। এটি বিশ্ব জুড়ে বিখ্যাত, কারণ এখানে রেকর্ড করা হয়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ জোয়ার-ভাটা, যেখানে পানির উচ্চতার পার্থক্য ১৬ মিটার বা ৫৩ ফুটের বেশি হয়। জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানি উঁচু পাথুরে স্তম্ভ ও সৈকতকে ঢেকে ফেলে আর ভাটার সময় পানি সরে গিয়ে তৈরি করে এক বিশাল সমতল ভূমি। জোয়ার-ভাটার এই অনবরত ওঠানামা এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে প্রতিনিয়ত বদলে দেয়।
সিঁড়ি বেয়ে নামতেই মনে হয়, আমরা সমুদ্রের তীরে নয়, সরাসরি সমুদ্রের ভেতরে হাঁটছি
এখানকার মাটি ও পাথরের লাল রঙ ভ্রমণকারীদের দারুণভাবে কৌতূহলী করে তোলে। এই রঙের প্রধান কারণ আয়রন অক্সাইড বা লৌহ-অক্সাইড। এ অঞ্চলের পুরনো শিলাস্তরে থাকা লোহা বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় জারিত হয়েছে। এই জারণের ফলেই পাথর ও কাদামাটি লালচে, কমলা ও বাদামি রঙ ধারণ করেছে। প্রায় ২০ কোটি বছর আগের ট্রায়াসিক যুগের লাল বেলেপাথর ও কর্দম শিলার উপস্থিতি এই উপকূলকে আরও বেশি স্বতন্ত্র করে তুলেছে। জোয়ারের স্রোত, ঢেউ এবং ক্ষয়ের সম্মিলিত প্রভাবে কোথাও উঁচু পাথুরে স্তম্ভ, কোথাও গর্ত, আবার কোথাও অদ্ভুত আকৃতির শিলা তৈরি হয়েছে, যার কিছু অংশকে নোভা স্কশিয়ার পর্যটন কর্তৃপক্ষ ‘টিপট রক ফরমেশন’ হিসেবেও উল্লেখ করেছে।
এই স্থানে দাঁড়ালে জোয়ারের প্রবল শক্তি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপসাগর বে অব ফান্ডিতে প্রতিদিন দুবার প্রায় ১৬০ বিলিয়ন টন পানি প্রবেশ করে এবং বেরিয়ে যায়। উপসাগরের দীর্ঘ, সরু ও ফানেল আকৃতির গঠন জোয়ারের পানি একদিকে সঞ্চিত করে। যার ফলে পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণের সঙ্গে উপসাগরের আকৃতি ও পানির প্রাকৃতিক দোলনের মিলনেই এই বিশাল জোয়ারের সৃষ্টি হয়। লাল পাথুরে গঠন, ছোট ছোট গর্তে জমে থাকা পানি এবং শ্যাওলা-ধরা সবুজ অংশগুলো প্রমাণ করে যে, এই স্থান নিয়মিত সমুদ্রের পানির নিচে ডুবে থাকে।
জোয়ার-ভাটার এই পরিবর্তনে দিনে দুবার পুরো এলাকা ডুবে যায় এবং দুবার শুকিয়ে যায়। এ কারণে এখানে ঘুরতে গেলে টাইড টেবিল আগে থেকে দেখে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ভাটার সময় হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেলে জোয়ার শুরু হওয়ার পর পানি দ্রুত ফিরে আসে এবং আটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালে এই এলাকা বিশ্বের সর্বোচ্চ জোয়ার-ভাটার জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান পায়, যা পরে ১৯৯৮ সালে কানাডিয়ান হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস কর্তৃক পুনরায় নিশ্চিত করা হয়।
বন্ধুত্বের উষ্ণতা, নোভা স্কশিয়ার উপকূলের নির্মল বাতাস এবং কয়েক ঘণ্টার জন্য সমুদ্রের তলদেশে হাঁটার অনুভূতি মিলে দিনটি হয়ে উঠেছিল অসাধারণ। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একই স্থান কখনো সমুদ্র, আবার কখনো পথ হয়ে উঠতে পারে। আর এই পরিবর্তনশীল ভূদৃশ্যই এই পার্কের সবচেয়ে বড় জাদু।
সমুদ্র কখনো কাছে আসে, কখনো দূরে সরে যায়; কখনো তার নিচে লুকিয়ে থাকে লাল পাথর, কাদা, জলকুণ্ড ও প্রাণের চিহ্ন, আবার কখনো সেই সবকিছুকে ঢেকে দেয় বিশাল জলরাশি।



