কান্তজিউর দেয়ালে চীনা পৌরাণিক রহস্য

কান্তজিউর হাজারো টেরাকোটার মধ্যে অদ্ভুত গড়নের এক প্রাণীর টেরাকোটায় দৃষ্টি আটকে গিয়েছিল গবেষক ইসমে আজম ঋজুর। লিখেছেন রহস্যময় সেই টেরাকোটা নিয়ে
কান্তজিউর দেয়ালে রহস্যময় প্রাণীর টেরাকোটা
কান্তজিউ মন্দিরে গেলে তার টেরাকোটা অনায়াসে সবাইকে বিস্মিত করে। আমি ঘুরেফিরে টেরাকোটা প্রাণীগুলোকে বাস্তবের প্রাণীদের সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করি। তারপরই নজর কাড়ল ওই আশ্চর্য জন্তুটি।
এটা আবার কী? দেখতে গরু বা ষাঁড়ের মতো, আবার গায়ে মাছের আঁশ, পায়ে ক্ষুর, পিঠে জিন। চিরাচরিত স্বভাব, অদ্ভুতদর্শন প্রাণীটির গুষ্টি উদ্ধার করতে বেশি সময় লাগল না। অনুমান করলাম, পৌরাণিক এই ক্ষুরযুক্ত প্রাণীটির নাম ‘কিলিন’, যাকে আবার কিরিন বা চি-লিন নামেও ডাকা হয়। অঞ্চলভেদে কারিগর, স্থান বা লোকাচারে এর গঠনে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেলেও মূলত এটি চীনা পৌরাণিক কাহিনিরই এক অনন্য চরিত্র।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, কান্তজিউ মন্দিরের টেরাকোটায় ফুটিয়ে তোলা এই প্রাণীটির সঙ্গে চীনের ইউয়ান রাজবংশের (১২৭১-১৩৬৮) একটি সিরামিক প্লেটে অঙ্কিত পৌরাণিক কিলিনের হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও কেউ কেউ টেরাকোটার প্রাণী দুটিকে গণ্ডার ও গণ্ডার শিকারের ঘটনার উপস্থাপন বলে চিত্রায়িত করেছেন।
কিলিন চীনা ও পূর্ব এশিয়ার পুরাণের চার মহৎ এবং পবিত্রতম জীবের অন্যতম প্রধান একটি জীব (বাকি তিনটি হলো ড্রাগন, ফিনিক্স ও কচ্ছপ)। সে মূলত শান্তি, সৌভাগ্য, দীর্ঘায়ু এবং দেবত্বের পরম প্রতীক।
এটি একটি জাদুকরী মিশ্র বা কাইমেরা জীব। এর মাথাটি কোথাও ড্রাগনের মতো, কোথাও ষাঁড়ের মতো। মাথায় হরিণের মতো শিং, শরীরটি হরিণ বা ঘোড়ার মতো, গায়ে ড্রাগন বা মাছের মতো আঁশ, লেজটি সিংহ বা ষাঁড়ের মতো এবং চার পা ক্ষুরযুক্ত। মিথ অনুসারে,
কিলিনের বসবাস স্বর্গের পবিত্র উদ্যান অথবা মর্ত্যের কেবল সেই সমস্ত রাজ্যে, যেখানে একজন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ, দয়ালু ও জ্ঞানী রাজা শাসন করেন। কিলিন পরম অহিংস ও পবিত্র স্বভাবের। সে প্রকৃতির সবচেয়ে দয়ালু জীব।
কিন্তু কান্তজিউ মন্দিরের কারিগররা এই কিলিনের সন্ধান কীভাবে পেলেন, সেটাই রহস্য।
কিলিনের পরিচয় না হয় একটা পেলাম, কিন্তু টেরাকোটা কী বলছে? দুই টেরাকোটাতেই কোণঠাসা কিলিনের পিঠে বাঁধা জিন ফাঁকা, তাতে কেউ বসা নেই। পিঠের ওপর সাপের ফণা ফোঁস ফোঁস করছে, সৈন্যদের আক্রমণে কিলিন দিশাহারা...!
এল সি রুকমেকারের দ্য রাইনোসারস অব সাউথ এশিয়ার চ্যাপ্টার ৩০-এ হিস্টোরিক্যাল রেকর্ডস অব দ্য রাইনোসারস ইন ফরমার আনডিভাইডেড বেঙ্গলে টেরাকোটার এই প্রাণী দুটিকে গণ্ডার ও টেরাকোটায় উপস্থাপিত ঘটনাকে গণ্ডার শিকারের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যা আমার কাছে কোনোক্রমে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।
কারণ, টেরাকোটার প্রাণী দুটি কোনো দিক থেকেই গণ্ডারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। কান্তজিউ মন্দিরে হাজারো টেরাকোটায় বিভিন্ন প্রাণীর অবয়ব ও তাকে নিয়ে ঘটনার আবির্ভাব ঘটেছে। বেশিরভাগ প্রাণী, যেমন— বাঘ, হাতি, কুকুর, বানর, নেকড়ে, পাখি, সাপ ইত্যাদি সাধারণ পর্যবেক্ষণে শনাক্ত করা যায়। উল্লেখ্য, এই মন্দির নির্মাণকালীন (১৭০৪ থেকে ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দ) ওই অঞ্চলে গণ্ডার দুর্লভ প্রাণী ছিল না। ফলে মন্দিরের টেরাকোটা শিল্পীদের জন্য তা চাক্ষুষ দেখা ও তার অবয়ব টেরাকোটায় উপস্থাপন করা অসম্ভব কিছু ছিল না। এমনকি গণ্ডারের অবয়বে ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কান্তজিউ মন্দিরের উল্লিখিত টেরাকোটায় প্রাণীটিকে যে দৃশ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যাও বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করবে।
টেরাকোটায় উপস্থাপিত কল্পিত প্রাণীটির গায়ে গণ্ডারের বর্ম নেই, তার পরিবর্তে আছে আঁশযুক্ত দেহ বর্ম। টেরাকোটা কারিগর গণ্ডারের গায়ে বর্মের পরিবর্তে আঁশের ব্যবহার কেন করবেন?
কান্তজিউর দেয়ালে টেরাকোটায় কিলিনের হাজির হওয়ার বিষয়টি একেবারে অলীক মনে করি না আমি। কেননা শিল্পী দলে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বহু নির্মাণ শিল্পী ও তাদের সঙ্গে এসেছিল অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, নিজ নিজ লোকাচার, গল্প, কেচ্ছা-কাহিনি, বিশ্বাস আর শিল্পীমনের স্বাধীন কল্পনা। তার থেকেই হয়তো কাদামাটি কারিগরের মনের খেয়ালে রূপ নিয়েছে চীনা পৌরাণিক রহস্য কিলিন।



