প্রাণ ও প্রকৃতি
সাতছড়ির ভালুক

সাতছড়ির বনে যে ভালুক আছে, সে কথা জানা ছিল বহু বছর ধরেই। কিন্তু এই বিপজ্জনক প্রাণীকে ঘাঁটিয়ে বিপদ ডেকে আনার কোনো বাসনা ছিল না। মাঝখানে ছবি তুলতে গিয়ে বনের একবারে গহিনে, ভারত সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে এক স্থানীয় বাসিন্দার দেখা পেয়েছিলাম। সম্ভবত লাকড়ি কুড়াতে এসেছিলেন। সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভাই, আর সামনে আগাইয়েন না। এদিকে ভালুক আছে, ওই দিন আমাকে কঠিন দৌড়ানি দিছিল। অল্পের জন্য বাঁচছি!’ তার কথা শোনার মাত্র কয়েক দিন পর ওই এলাকারই একটি গাছের গায়ে ভালুকের থাবার আঁচড় দেখতে পাই। তার পর থেকে আরও সতর্ক হয়ে যাই।
কিন্তু প্রকৃতি নিজেই যখন চমক নিয়ে হাজির হয়, তখন আর ঠেকায় কে?
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। বরাবরের মতো সকাল সকাল সাতছড়ির ওয়াচ টাওয়ারে চড়ে বসি। মান্দার গাছ আর চারপাশের ডালে বসা হরেক রকমের পাখির ছবি তুলি। তারপর দুপুরে লাঞ্চ সেরে সোজা চলে যাই বনের ভেতরের দিকের পুকুরপাড়ে। আমরা তিন বন্ধু মিলে অপেক্ষায় রইলাম— কখন তৃষ্ণার্ত পাখিরা পুকুরপাড়ে পানি খেতে ও দলবেঁধে গোসল করতে নামবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর যেন আর ফুরোয় না। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিল গাছের ডালে বসা একটি বানরের অস্বাভাবিক চেঁচামেচি। ঠিক তখনই আমার বন্ধু নাজিম ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘গাছের আড়ালে কালো কী যেন একটা নড়ছে!’
কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তার পরেই আমাদের সমস্ত বুক ধুকপুকানি থামিয়ে দিয়ে সবাইকে রীতিমতো চমকে দিয়ে গহিন জঙ্গল থেকে ধীরে-সুস্থে পুকুরপাড়ে নেমে এলো এক আস্ত ভালুক! সরাসরি পানির দিকে এগিয়ে গেল তেষ্টা মেটাতে। চোখের সামনে ঘাস মাড়িয়ে প্রাণীটির হেঁটে আসতে দেখার সেই রোমাঞ্চকর অনুভূতি কখনোই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বুক কাঁপানো ভয়ের মধ্যেই দ্রুত ক্যামেরার শাটার টিপে কয়েকটি ছবি তুলে আমরা নিরাপদ দূরত্বে সরে এলাম। তৃষ্ণা মিটিয়ে ভালুকটিও আবার হারিয়ে গেল বনের গভীরে।
ভালুকের ছবি তোলা ভাগ্যের ব্যাপার, তবে ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার বন্ধুদের অনুরোধ করব— কেউ যেন অতি উৎসাহী হয়ে এই বন্য প্রাণীর ছবি তুলতে গিয়ে নিজের জীবনকে বিপন্ন না করেন।







