অন্তরালের মানুষ

শেখ আবদুল হাকিম (১৯৪৬-২০২১) আঁকা: সোহানুর রহমান
বাংলাদেশের রহস্য-সাহিত্য লেখকদের অন্যতম শেখ আবদুল হাকিম। প্রচারের অন্তরালে থাকা এই মানুষটির পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের এই আয়োজন
যদি আপনার মতো লিখতে পারতাম
সেবা প্রকাশনীর লেখকদের মধ্যে হাকিম ভাই— অর্থাৎ শেখ আবদুল হাকিম— আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক। আমার মনে পড়ে, শেষবার যখন তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল, তখন বলেছিলাম, ‘আমি সবসময় চেয়েছি যেন আপনার মতো সাধু গদ্যে লিখতে পারি।’ শুনে তিনি প্রাণখোলা হাসি দিয়েছিলেন।
সেবা প্রকাশনীতে স্বল্প সময়ে হাকিম ভাইকে যতটুকু পেয়েছি, সেখানে লেখালেখির বাইরে মূলত কথা হতো তার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে। তার গল্প বলার ভঙ্গিটি ভারি চমৎকার, মুগ্ধ হয়ে শোনার মতো এবং মুগ্ধ হয়েই শুনতাম। মিরপুর তখন তো পুরোটাই জঙ্গল— হাকিম ভাইয়ের ছোটবেলার কথা। মিরপুর থেকে জঙ্গলে ঢুকেছেন এবং হারিয়ে গেছেন। সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল; তারা কোথায় চলে গেছে, জানেন না। শেষ পর্যন্ত সকালবেলা ঢুকেছেন, হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যার দিকে বেরিয়েছেন টঙ্গী দিয়ে! তারপর সেখান থেকে কপর্দকহীন অবস্থায় কীভাবে ঢাকায় ফিরেছেন, সে আরেক গল্প!
হাকিম ভাই সবসময় ছিলেন একজন সরল ও চমৎকার মানুষ এবং বন্ধু হিসেবে তিনি অসাধারণ
মনে পড়ে, তার বড় ভাই শেখ আবদুর রহমানের কথা বলেছিলেন একবার। ’৭১ সালে পাকিস্তানি আর্মি ধরে নিয়ে যাচ্ছে ট্যাক্সি করে। শেখ আবদুর রহমান আতঙ্কে সম্পূর্ণ বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন, প্রলাপ বকছেন। সঙ্গে ছিলেন একজন, তিনি তার পরিচয় দিলেন যে মস্ত বড় ব্যবসায়ী, প্রচুর টাকা-পয়সা আছে। তাকে ক্যান্টনমেন্টে না নিয়ে বরং ব্যবসার জায়গায় নিয়ে গেলে ওই পাকিস্তানি আর্মির সৈনিককে প্রচুর ইনাম দেওয়া হবে। ট্যাক্সি যখন প্রায় ক্যান্টনমেন্টে ঢুকবে (পুরনো এয়ারপোর্টের কাছে), তখন সেই সৈনিকটি আর লোভ সংবরণ করতে পারেননি। তারা ট্যাক্সি ঘুরিয়ে চলে এসেছেন পুরান ঢাকায়। তখন হাকিম ভাইয়ের বড় ভাই শেখ আবদুর রহমান এবং ওই ভদ্রলোক সৈনিকটিকে একটা দোকানে বসিয়ে রেখে বললেন, ‘আমরা টাকা আনতে যাচ্ছি’— এই বলে দুজনেই চম্পট দিলেন।
এ ছাড়া আরও বহু গল্প... যেমন ঢাকার ওপরতলার লোকদের অন্ধকার জীবন নিয়ে। হাকিম ভাইয়ের বিস্তর অভিজ্ঞতা ছিল এগুলোতে। বিশেষ করে ভণ্ড জাদুকর ও সম্মোহন শেখানোর নামে তারা কী ধরনের অনাচার বা প্রতারণা করতেন, সেগুলো তার কাছ থেকে জেনেছি। তৎকালীন নামকরা কিছু মানুষের অন্ধকার দিকগুলোও হাকিম ভাইয়ের মুখে শোনা।
আমার কাছে হাকিম ভাই সবসময় ছিলেন একজন সরল ও চমৎকার মানুষ এবং বন্ধু হিসেবে তিনি অসাধারণ।
হাকিম ভাইয়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও (অন্তত আমার কাছে) তার সরলতা। এ কারণেই হাকিম ভাইকে কেউ কেউ ভুল বুঝিয়েছেন বা ভুল পথে পরিচালিত করেছেন কিংবা তাদের পরামর্শে হাকিম ভাই ভুল কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যার জন্য বলা চলে তার জীবনের শেষ অংশটুকু সুখময় হয়নি। সেজন্যই দুঃখ হয়।
তবে আমি সবসময় তার গুণমুগ্ধ পাঠক ছিলাম, এখনো আছি। হাকিম ভাইকে যদি আরেকবার বলতে পারতাম, ‘এখনো মনে করি, আমি যদি আপনার মতো করে লিখতে পারতাম!’
লেখক: সেবা প্রকাশনীর স্বর্ণযুগের বিখ্যাত লেখকদের একজন







