সাগর সেচে ‘মুক্তা’ আনেন শরীফ

ছবি: শরীফ সারওয়ার
নতুন কিছু দেখার অদম্য তাড়নায় ফটো সাংবাদিক শরীফ সারওয়ার। স্কুবা ডাইভার এবং আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার হিসেবে পরিচিত সেই মানুষটির গল্প বলেছেন সৈয়দ ফরহাদ
মালদ্বীপের শার্ক পয়েন্টের নীল অন্ধকারে ধীরে ধীরে নামছিলেন নিচে। চারপাশে প্রবাল, দূরে ভেসে বেড়ানো রুপালি মাছের ঝাঁক। হঠাৎই শরীফ সারওয়ার টের পেলেন, কিছু একটা বদলে গেছে। ডানে তাকাতেই একটি হাঙর। বাঁয়ে আরেকটি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সামনে, পেছনে, মাথার ওপর— চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল বিশাল হাঙরের ঝাঁক।
‘ডানে, বাঁয়ে, সামনে সবখানে শুধু হাঙর। সেদিন সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম’— স্মৃতি হাতড়ে বলছিলেন তিনি।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, কোনো হাঙরই আক্রমণ করেনি। তারা শুধু ঘুরছিল।
শরীফ সারওয়ার বললেন, ‘হাঙর খুব শান্ত প্রাণী। আপনি যদি তার জন্য হুমকি হয়ে না ওঠেন, তবে সে কখনো আক্রমণ করবে না।’
দীর্ঘদিন দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ফটোসাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন শরীফ।
‘ভালো ছবির জন্য একটা ক্ষুধা সবসময় কাজ করত।’ এ ক্ষুধাই তাকে একদিন নিয়ে যায় সমুদ্রের কাছে। টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ও ডিসকভারি চ্যানেলের আন্ডারওয়াটার ডকুমেন্টারিগুলো গভীরভাবে আকৃষ্ট করত শরীফকে।
তিনি ভাবতে শুরু করলেন, এত নদী-খাল-বিল, সমুদ্রবেষ্টিত একটি দেশের পানির নিচে কি দেখার মতো কিছুই নেই?
সেখান থেকেই শুরু অনুসন্ধান। একসময় খোঁজ পান সেন্টমার্টিনে ওশেনিক স্কুবা ডাইভিং সেন্টারের। ২০১২ সালে তাদের সহায়তায় প্রথমবার ডাইভ দেন।
প্রথম ডুবের অভিজ্ঞতা মনে করে বলেন, ‘পাঁচ-সাত ফুট নিচে গিয়েই মনে হচ্ছিল, আমি কি আর ওপরে উঠতে পারব?’ মনে হচ্ছিল, কিছু একটা এগিয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভয় কেটে যায় আর তখনই উন্মোচিত হয় এক বিস্ময়কর জগৎ।
এরপর ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেন সমুদ্রের জগতে। একসময় ফটোসাংবাদিকতার চাকরিও ছেড়ে দেন।
শরীফ সারওয়ার জানান, সেন্টমার্টিনের ওশেনিক স্কুবা ডাইভিং সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা এস এম আতিকুর রহমান তার পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে ‘পাডি ইন্সট্রাক্টর’ আসাদুজ্জামান তালুকদারের উৎসাহে হয়ে ওঠেন ডাইভ মাস্টার।
পানির নিচের জগৎ যেমন মোহময়, তেমনি কঠিনও। বাংলাদেশের সমুদ্রে দৃশ্যমানতা তুলনামূলক কম। দেশের ভেতরে সেন্টমার্টিন, সোয়াচ অব নো গ্ৰউন্ডসহ দেশের বাইরের সাগরতলের প্রাণবৈচিত্র্যের অসাধারণ সব ছবি তুলেছেন শরীফ। অনেক সময় সাত মিটারের বেশি নিচে গেলেই ঝাপসা হয়ে আসে চারপাশ।
কেমন সেই অনুভূতি?
শরীফ সারওয়ার বললেন, ‘খালি চোখে কিছুই বোঝা যায় না। কিন্তু মাস্ক পরে তাকালেই সব দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’
শরীফ জানান, পানির নিচে কোনো প্রাণীর কাছে গেলে দূরত্ব বজায় রাখা, তাদের চলাচলে বাধা না দেওয়া এসবই ডাইভিংয়ের মৌলিক শিষ্টাচার।
এ জগতে টিকে থাকতে হলে শৃঙ্খলা জরুরি। স্কুবা ডাইভিংয়ে শিক্ষানবিশদের জন্য ‘বাডি’ বা সঙ্গী বাধ্যতামূলক।
পানির নিচের জগৎ নিয়ে শরীফের একটি কথা বিস্ময় জাগায়, ‘এ পর্যন্ত যত প্রাণী দেখেছি, কাউকেই অ্যাগ্রেসিভ মনে হয়নি।’
শরীফ সারওয়ারের স্পষ্ট কথা, ‘স্কুবা ডাইভিং হুট করে করা যায় না। এর জন্য সঠিক ট্রেনিং দরকার।’ তিনি ‘রেসকিউ ডাইভার’ কোর্সের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে শেখানো হয় পানির নিচে বিপদ সামলানোর কৌশল। শরীফ বিশ্ব জুড়ে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান ‘পাডি’ (পিএডিআই)-এর প্রশিক্ষণের কথাও বলেন। ‘পাডি’ অর্থ প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ডাইভিং ইন্সট্রাক্টর।
সাগরতলে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পানির চাপ। ‘আপনি যত গভীরে যাবেন, চাপ তত বাড়বে। প্রথমেই সেটা কানে অনুভব করবেন’— বলেন শরীফ।
‘২০১২ সাল থেকেই আমি পানির নিচে প্লাস্টিক দেখছি। সময় যত যাচ্ছে, এটা বাড়ছেই।’
শুধু সমুদ্র নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব নদীতেই তিনি একই দৃশ্য দেখেছেন, ‘এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে প্লাস্টিক নেই।’
তার মতে, একজন ভালো ডাইভারকে হতে হয় প্রকৃতিবান্ধব। ডাইভ দেওয়ার সময় শরীরের স্পর্শে প্রবালের ক্ষতি হচ্ছে কি না, সেটিও খেয়াল রাখতে হয়।




