পাসিংপাড়া : সবচেয়ে উঁচু গ্রাম

বান্দরবান অনেক দিক থেকেই অনন্য। দেশের সবচেয়ে উঁচু পর্বত, উঁচু রাস্তা, পাহাড় ও ঝরনাপ্রেমীদের প্রথম পছন্দ, আরও কত কী! এর সঙ্গে যোগ করতে পারেন আরেকটি তথ্য— দেশের সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত জনবসতি ‘পাসিংপাড়া’র অবস্থানও এ জেলাতেই। পাড়াটি নিয়ে লিখেছেন মনু ইসলাম
কোথাও খাড়া পাহাড় কেটে নামানো ফিতার মতো সড়ক, কোথাও মেঘ ছুঁয়ে যাওয়া অতি ঢালু রোমাঞ্চকর পথ। রুমা উপজেলা সদর থেকে চাঁদের গাড়ি বা মোটরবাইকের গর্জন তুলে যখন মুনলাইপাড়া আর রহস্যময় বগালেক পেরিয়ে কেওক্রাডংয়ের চূড়ার দিকে রাস্তা এগোয়, তখন চারপাশের প্রকৃতি যেন প্রতিমুহূর্তে রূপ বদলায়। কেওক্রাডং চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছেই খাড়া ও ঢালু সড়কটি ধরে কিছুটা নামলেই দেখা মেলে মেঘের রাজ্যে থমকে থাকা এক স্বর্গের— পাসিংপাড়া। একসময় রুমা থেকে দুর্গম পাহাড় ডিঙিয়ে হেঁটে এ পাড়ায় পৌঁছাতে পুরো দুদিন লেগে যেত। আর এখন নতুন পাকা সড়কের কল্যাণে সেই পথ ঘণ্টা দেড়-দুইয়ে পাড়ি দেওয়া যায়। বাঁক ঘুরতেই চোখ জুড়িয়ে যায় সবুজ পাহাড় আর শ্বেতশুভ্র মেঘের অবিরাম লুকোচুরিতে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ফুটের বেশি উঁচুতে মেঘের রাজ্যে দাঁড়িয়ে আছে দেশের সর্বোচ্চ জনবসতি পাসিংপাড়া।
পাহাড়ের অন্যান্য পাড়ার মতোই এ পাড়ার নামকরণ হয়েছে এর কারবারি বা পাড়াপ্রধানের নামে। পাসিংপাড়ার প্রথম ও বর্তমান কারবারির নাম পাসিং ম্রো।
একসময় রুমা থেকে দুর্গম পাহাড় ডিঙিয়ে হেঁটে এ পাড়ায় পৌঁছাতে পুরো দুদিন লেগে যেত
উর্বর জুম চাষের জমির খোঁজে ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সালের কোনো একসময়ে আশপাশের এলাকা থেকে কিছু ম্রো পরিবার এখানে এসে বসতি গড়ে তুলেছিল বলে ধারণা করা হয়। সেই থেকে গত চার দশক ধরে পাসিং ম্রো এই পাড়ার অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে এ পাড়ায় ৩১টির মতো পরিবার বাস করে, যাদের সবাই ম্রো জনগোষ্ঠীর। জনসংখ্যার দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের পঞ্চম হলেও, বান্দরবানে তারা দ্বিতীয় বৃহত্তম জনজাতি।
মেঘের কাছাকাছি থাকার অপার সৌন্দর্য থাকলেও পাহাড়ের উঁচুতে বেঁচে থাকার সংগ্রামটা বড় কঠিন। গ্রামের যুবক মিনচ্যং ম্রো (৩৭) বলছিলেন, ‘আমাদের বসতি সবচেয়ে উঁচুতে, এটি গর্বের। কিন্তু পানির কষ্টে ভোগাটা আমাদের নিত্যদিনের দুঃখ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অনেক নিচের ঝিরিতে নেমে থুরং বা বাঁশের ঝুড়িতে কলসি, ডেকচি আর বোতল ভরে পানি এনে খাড়া পথ বেয়ে ওপরে ওঠা এক নিত্যদিনের পরীক্ষা। জুম চাষ ছাড়া আমাদের বিকল্প কোনো আয় বা পেশাও নেই।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকলেও দুটি উপাসনালয় আছে এ পাড়ায়। একটি ক্রামা ধর্মের, অন্যটি খ্রিস্টধর্মের গির্জা।
রুমা উপজেলার সংগঠক শৈ হ্লা চিং মারমা জানিয়েছেন, একসময় ম্রো এবং বম জনজাতি পাসিংপাড়ায় বাস করত। তখন পরিবার সংখ্যা ছিল ৫৫-৬০। পানির সুবিধা না থাকায় বম পরিবারগুলো আশপাশের পাড়ায় চলে যাওয়ায় এখন সেখানে বসবাস করছে ৩১টি পরিবার, তারা সবাই ম্রো। এদের মধ্যে ২২টি পরিবার ক্রামা ধর্মাবলম্বী, অন্যরা খ্রিস্টান।
তিনি আরও জানালেন, একসময় ম্রোরা প্রকৃতি পূজারী ছিলেন। আশির দশকে মেনলে ম্রো নামের এক যুবক ‘ক্রামা’ নামে একটি নতুন ধর্ম প্রবর্তন করেন। একই সঙ্গে তিনি ক্রামা বর্ণমালাও উদ্ভাবন করেন। এই বর্ণ ব্যবহার করেই রচিত হয় ক্রামা ধর্মগ্রন্থ। এর পরপরই ক্রামা ধর্মের আলো বান্দরবান জেলা সদরের ক্রামাদিপাড়া থেকে বন্ধুর পথ পেরিয়ে দ্রুতই পৌঁছে যায় দুর্গম পাসিংপাড়ায়।
কথা হয় পাড়ার বাসিন্দা মেনপা ম্রোর সঙ্গে। বয়স ৫০ ছুঁইছুঁই। কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে বললেন, ‘আমাদের পাসিংপাড়ার পাশেই সেনাবাহিনীর ক্যাম্প, এ কারণে সন্ত্রাসীদের তৎপরতাও নেই। যথেষ্ট নিরাপত্তা এবং মেঘের মধ্যে ভেসে থাকা এই গ্রামে পর্যটকদের অনেকেই রাতে থাকতে চান। কিন্তু বিদ্যমান প্রশাসনিক বিধান অনুযায়ী কেউ এখানে রাতে অবস্থান করতে পারেন না। আমরাও আবাসিক হোটেল বা রিসোর্ট করতে পারছি না।’ তিনি আরও বললেন, ‘দেশের সবচেয়ে উঁচু গ্রাম দেখতে প্রচুর পর্যটক আসা-যাওয়া করলেও এই বিকল্প আয় থেকে পাড়াবাসী বঞ্চিত হচ্ছেন।’
বগালেক ও কেওক্রাডংয়ের ভ্রমণের তালিকায় অনায়াসেই যুক্ত করে নিতে পারেন পাসিংপাড়াকেও। বর্ষা ও শীতের মাঝামাঝি সময়টুকুই কেওক্রাডং ও পাসিংপাড়া ভ্রমণের সেরা মৌসুম।







