তিন কিশোরের ‘৪১’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৮৫ সালের আগস্টে সেবা প্রকাশনী থেকে রহস্যপ্রেমী কিশোর-কিশোরীদের জন্য শুরু হয় নতুন এক সিরিজ। ৪১ বছর পূর্তিতে তিন গোয়েন্দা নিয়ে লিখেছেন তুষার ইশতিয়াক
১৯৮৩ সাল। রকিব হাসান তখন ব্যস্ত ‘আরব্য রজনী’র অনুবাদে। একদিন দুপুরের খাওয়া শেষে চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম করার সময় হঠাৎ চোখ গেল টেবিলের কোণে ধুলো জমে থাকা পুরনো একটি ইংরেজি বইয়ের দিকে। ধুলো ঝেড়ে নামটির দিকে তাকাতেই কৌতূহল জাগল— তেরোটি শব্দের এত লম্বা নাম! কে জানত এই ‘আনলাকি থার্টিন’ই একদিন তার জন্য হয়ে উঠবে পরম ‘লাকি’।
প্রথম অধ্যায় পড়ার পরই গল্পটি তাকে এমনভাবে আটকে ফেলে যে, এক বসায় পুরো বই শেষ করে ফেলেন। মনে হলো— এমন কিছুই তো ছোটবেলায় খুঁজে বেড়িয়েছেন! মুহূর্তেই মাথায় জন্ম নিল কিশোরদের উপযোগী একটি গোয়েন্দা সিরিজের ভাবনা। আরব্য রজনীর অনুবাদ স্থগিত রেখে একের পর এক বিদেশি কিশোর অ্যাডভেঞ্চার ও রহস্য সিরিজ গোগ্রাসে গিলতে লাগলেন, ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে লাগল মূল পরিকল্পনা।
ভাবনাটি শেয়ার করতেই প্রকাশনা জগতের অভিজ্ঞ জহুরি কাজী আনোয়ার হোসেন রাজি হয়ে গেলেন। রকিব হাসানও কিশোর, রবিন আর মুসাকে নিয়ে গড়ে তুললেন এক নতুন রহস্যজগৎ, জন্ম নিল কালজয়ী ‘তিন গোয়েন্দা’।
রকিব হাসান কখনো গোপন করেননি যে, রবার্ট আর্থার জুনিয়রের ১৯৬৪ সালে শুরু হওয়া জনপ্রিয় মার্কিন সিরিজ ‘দ্য থ্রি ইনভেস্টিগেটরস’ (যার প্রথম বই দ্য সিক্রেট অব টেরর ক্যাসল) থেকেই তিন গোয়েন্দার মূল কাঠামো এসেছে। তবে বাঙালি পাঠকের আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে জুপিটার জোনস, পিট ক্রেনশো ও রবার্ট বব রূপান্তরিত হয় আমাদের কিশোর পাশা, মুসা আমান ও রবিন মিলফোর্ড। স্কিনি নরিসের আদলে আসে মজার চরিত্র শুঁটকি টেরি। আর এনিড ব্লাইটনের দ্য ফেমাস ফাইভ সিরিজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যুক্ত হয় জিনা ও রাফিয়ান। কাহিনির মূল পটভূমি যুক্তরাষ্ট্রের কল্পিত শহর ‘রকি বিচ’।
১৯৮৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত প্রথম বই ‘তিন গোয়েন্দা’র সাফল্য ছিল অভাবনীয়। একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে কংকাল দ্বীপ, রূপালী মাকড়সা, ছায়াশ্বাপদ, মমি কিংবা কাকাতুয়া রহস্যের মতো বই। পরে মূল সিরিজের বইয়ের জোগান ফুরিয়ে গেলে রকিব হাসান অন্যান্য বিদেশি কিশোর রহস্য সিরিজের কাহিনি রূপান্তর শুরু করেন।
২০০২ সালের পর রকিব হাসান অন্যান্য প্রকাশনী থেকেও কিশোর-রবিন-মুসাকে নিয়ে লেখেন। অন্যদিকে ২০০৩ সালে সেবায় রকিব হাসান লেখার ইতি টানার পর ‘শামসুদ্দীন নওয়াব’ ছদ্মনামে লেখার দায়িত্ব নেন কাজী শাহনূর হোসেন, কাজী মায়মুর হোসেন।
তিন গোয়েন্দা লিখেছেন বাংলা রহস্য সাহিত্যের দুই দিকপাল কাজী আনোয়ার হোসেন আর শেখ আবদুল হাকিমও।
১৯৯২ সালে ক্যাডেট কলেজে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিন গোয়েন্দার ভক্ত ইসমাইল আরমান লেখেন ‘অয়ন-জিমি’ সিরিজের প্রথম বই কালকুক্ষি। ওটা আদতে ছিল তিন গোয়েন্দার ফ্যান ফিকশন।
রকিব হাসান ২০২৫ সালের অক্টোবরে আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন। সেবা প্রকাশনী পুনর্গঠনের কাজ চলায় আপাতত সেখান থেকেও প্রকাশ হচ্ছে না নতুন তিন গোয়েন্দা। তবে ভক্তরা এখনো কাকাতুয়া রহস্য, ভীষণ অরণ্য কিংবা ঘড়ির গোলমালের মতো কোনো মাস্টার পিস হাতে নিয়ে তিন গোয়েন্দার সঙ্গে হারিয়ে যান রহস্য-রোমাঞ্চের জগতে।







