এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬
জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র

সৃজনশীল প্রশ্ন -১
জীববিজ্ঞানের শিক্ষক ল্যাবরেটরিতে শিক্ষার্থীদের তিনটি ভিন্ন প্রাণীর অনুপ্রস্থচ্ছেদ দেখালেন। প্রথম প্রাণীটির দেহগহ্বরটি মেসোডার্মাল কোষে আবৃত নয় এবং তরলে পূর্ণ। দ্বিতীয় প্রাণীটির দেহগহ্বরটি পেরিটোনিয়াম পর্দা দ্বারা আবৃত এবং প্রকৃত প্রকৃতির। অন্যদিকে তৃতীয় প্রাণীটির কোনো দেহগহ্বরই নেই, সেটি স্পঞ্জি প্যারেনকাইমা কোষে ভরাট করা। শিক্ষক বললেন, ‘এই গাঠনিক গহ্বরের ভিন্নতাই প্রাণীগুলোকে আলাদা গ্রুপে বিভক্ত করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।’
(ক) জ্ঞানমূলক: সিলোম (Coelom) কী?
(খ) অনুধাবনমূলক: শিখা কোষ (Flame cell) বলতে কী বোঝায়?
(গ) প্রয়োগমূলক: উদ্দীপকে উল্লিখিত প্রথম ও দ্বিতীয় প্রাণী দুটির অনুপ্রস্থচ্ছেদের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে গঠিত গ্রুপ দুটির
মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য দেখাও।
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক: ‘প্রাণী শ্রেণিবিন্যাসকরণে উদ্দীপকের শেষ লাইনে শিক্ষকের উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ’— উক্তিটির যথার্থতা মূল্যায়ন করো।
(ক) উত্তর:
বহুস্তরী প্রাণীর ভ্রূণীয় বিকাশের সময় মেসোডার্ম (মধ্যস্তর) থেকে উৎপন্ন, পেরিটোনিয়াম নামক মেসোডার্মাল পর্দায় আবৃত প্রকৃত দেহগহ্বরকে সিলোম (Coelom) বলে।
প্রকৃত সিলোমের দুটি ছোট উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
কেঁচো (Metaphire posthuma) — অ্যানেলিডা পর্বের প্রাণী।
মানুষ (Homo sapiens) — কর্ডাটা পর্বের প্রাণী।
খ) উত্তর:
প্লাটিহেলমিনথিস (Platyhelminthes) বা চ্যাপ্টাকৃমি জাতীয় প্রাণীদের দেহে রেচন ও অসমোরেগুলেশন (পানি সাম্যতা) নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়োজিত বিশেষ ধরনের অতি ক্ষুদ্র, অন্ধ (Closed) এবং সিলিয়াযুক্ত রূপান্তরিত কোষকে শিখা কোষ (Flame cell) বলে।
নামকরণের কারণ:
এই কোষের অভ্যন্তরে অবস্থিত সিলিয়াগুচ্ছ বা ফ্লাজেলাসমূহ যখন একসঙ্গে অনবরত স্পন্দিত হতে থাকে, তখন বাইরে থেকে দেখতে তা ঠিক প্রদীপের মৃদু জ্বলন্ত শিখার মতো মনে হয়। এই বিশেষ গাঠনিক রূপের কারণেই এদের নাম ‘শিখা কোষ’।
কার্যপদ্ধতি:
বর্জ্য অপসারণ: এরা চারপাশের প্যারেনকাইমা কলা থেকে নাইট্রোজেনঘটিত তরল বর্জ্য পদার্থ শোষণ করে রেচন নালিকায় পাঠায়।
পানি সাম্যতা রক্ষা: সংগৃহীত বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি রেচন নালির মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়ে শেষে রেচন ছিদ্রের (Excretory pore) মাধ্যমে দেহের বাইরে নিষ্ক্রান্ত হয়।
(গ) উত্তর:
উদ্দীপকে উল্লিখিত প্রথম প্রাণীটির দেহগহ্বর মেসোডার্মাল কোষে আবৃত নয়, যা অপ্রকৃত সিলোম বা স্যুডোসিলোমকে (Pseudocoelom) নির্দেশ করে (যেমন: নেমাটোডা পর্ব)।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় প্রাণীটির দেহগহ্বর পেরিটোনিয়াম পর্দা দ্বারা আবৃত এবং প্রকৃত প্রকৃতির, যা প্রকৃত সিলোম বা ইউসিলোমকে (Eucolom) নির্দেশ করে (যেমন: অ্যানেলিডা, আর্থ্রোপোডা, কর্ডাটা পর্ব)।
নিচে এদের অনুপ্রস্থচ্ছেদের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে গঠিত গ্রুপ দুটির মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য
দেখানো হলো:
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক প্রশ্নের উত্তর:
উদ্দীপকের শেষ লাইনে শিক্ষকের উক্তিটি হলো— ‘এই গাঠনিক গহ্বরের ভিন্নতাই প্রাণীগুলোকে আলাদা গ্রুপে বিভক্ত করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।’ প্রাণী শ্রেণিবিন্যাসকরণে এই উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও যুক্তিযুক্ত। নিচে এর যথার্থতা মূল্যায়ন করা হলো:
১. প্রাণী শনাক্তকরণ ও দলভুক্তকরণ:
প্রাণিজগতের বিশাল বৈচিত্র্যকে সুনির্দিষ্ট নিয়মে সাজাতে ‘সিলোম’ একটি মৌলিক শারীরিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। উদ্দীপকের তিনটি ভিন্ন চিত্র মূলত সিলোমের তিনটি প্রধান অবস্থাকে নির্দেশ করে:
প্রথমটি অপ্রকৃত সিলোম (স্যুডোসিলোমেট - যেমন: নেমাটোডা, রটিফেরা)।
দ্বিতীয়টি প্রকৃত সিলোম (ইউসিলোমেট - যেমন: অ্যানেলিডা থেকে কর্ডাটা)।
তৃতীয়টি সিলোমবিহীন অবস্থা (অ্যাসিলোমেট - যেমন: পরিফেরা, নিডারিয়া, প্লাটিহেলমিনথিস)।
২. বিবর্তনীয় ধারা ও জটিলতা নির্ধারণ:
সিলোমের উপস্থিতি ও প্রকৃতি দেখে প্রাণীর বিবর্তনীয় অবস্থান বা ফাইলোজেনি (Phylogeny) বোঝা যায়। সিলোমহীন বা অ্যাসিলোমেট প্রাণীরা গাঠনিকভাবে সরল এবং আদিম। বিবর্তনের ধারায় সিলোমের বিকাশ প্রাণীর অভ্যন্তরীণ অঙ্গসংস্থানকে আরও জটিল, সুরক্ষিত ও উন্নত করেছে। যেমন— প্রকৃত সিলোম সৃষ্টির ফলেই প্রাণীদের দেহে উন্নত রক্ত সংবহনতন্ত্র এবং উন্নত পরিপাকতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব হয়েছে।
৩. অঙ্গের সুরক্ষায় গহ্বরের ভূমিকা:
সিলোমের ভেতরের তরল পদার্থ (Coelomic fluid) চারপাশের ধাক্কা বা চাপ থেকে অভ্যন্তরীণ নরম অঙ্গগুলোকে রক্ষা করে হাইড্রোস্ট্যাটিক কঙ্কাল হিসেবে কাজ করে। যেসব প্রাণীতে এই গহ্বর নেই (তৃতীয় প্রাণী), তাদের শারীরিক নমনীয়তা ও জটিলতা অনেক কম।
অতএব বলা যায়, সিলোম বা দেহগহ্বর শুধু একটি ফাঁকা স্থান নয়, এটি প্রাণীর সামগ্রিক গাঠনিক জটিলতা, অঙ্গের স্বাধীনতা এবং বিবর্তনের স্তর নির্দেশ করে। তাই প্রাণিজগতকে বড় বড় প্রধান গ্রুপ বা পর্বে নিখুঁতভাবে বিভক্ত করার ক্ষেত্রে সিলোমকে অন্যতম প্রধান ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা শিক্ষকের উক্তিটি সম্পূর্ণ যথার্থ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়





