স্ট্রোক থেকে বাঁচতে কী করবেন

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
স্ট্রোক হলে স্বাভাবিক চলাফেরা, কথা বলা কিংবা দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা হারাতে পারে মানুষ। এমনকি এটি কেড়ে নিতে পারে জীবনও। এ বিষয়ে লিখেছেন ডা. জারিন তাসনিম
স্ট্রোক বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। একজন সুস্থ ও কর্মক্ষম মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হারিয়ে ফেলতে পারেন স্বাভাবিক চলাফেরা, কথা বলা কিংবা দৈনন্দিন সব কাজ করার ক্ষমতা। এমনকি অনেক সময় এটি কেড়ে নেয় জীবনও। উদ্বেগের বিষয়, স্ট্রোক এখন আর বয়স্কদের রোগ নয়; তরুণ ও মধ্যবয়সীরাও সমানভাবে এর ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। তবে সঠিক সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণে রাখলে অধিকাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ মানুষ নতুন করে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন এবং বিশ্বে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো সময় স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকেন।
বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ২৯ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। স্ট্রোক নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টিই এর মূল কারণ। এবারের স্ট্রোক দিবসের মূল বার্তা— ‘Every Minute Counts’, অর্থাৎ প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্রোক কেন হয়?
মস্তিষ্কের কোষ সচল রাখতে নিয়মিত অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্ত প্রয়োজন। কোনো কারণে মস্তিষ্কের একটি অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়। রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ফলে শরীরের একপাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা বলতে অসুবিধা, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া কিংবা অচেতন হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্ট্রোক প্রধানত দুই ধরনের। ইসকেমিক স্ট্রোকে রক্ত জমাট বেঁধে মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে হেমোরেজিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ ঘটে। দুই ধরনের স্ট্রোকই গুরুতর হতে পারে। তবে চিকিৎসাপদ্ধতি আলাদা হওয়ায় সিটি স্ক্যানসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে স্ট্রোকের ধরন নির্ণয় করা জরুরি।
যেসব কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে
স্ট্রোকের অন্যতম ঝুঁকির কারণ উচ্চ রক্তচাপ। দীর্ঘদিন রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত থাকলে মস্তিষ্কের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকের উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে রোগটি শনাক্ত না হওয়ায় একসময় স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, বেশি ওজন ও হৃদরোগ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। হৃদযন্ত্রের অনিয়মিত স্পন্দন বা অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন থাকলে হৃদযন্ত্রে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। সেই জমাট রক্ত মস্তিষ্কের রক্তনালিতে পৌঁছে স্ট্রোক ঘটাতে পারে। ধূমপান, তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার, অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অতিরিক্ত মদপানও শঙ্কা বাড়ায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকি বাড়লেও তরুণদের ক্ষেত্রে স্ট্রোকের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পরিবারে স্ট্রোকের ইতিহাস থাকলেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
স্ট্রোকের লক্ষণ চিনবেন যেভাবে
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত মূল্যবান। এর লক্ষণগুলো হঠাৎ প্রকাশ পায়। মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া, একপাশের হাত বা পা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা বুঝতে সমস্যা হওয়া, হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, হাঁটার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া কিংবা তীব্র মাথাব্যথা— এসবই স্ট্রোকের সতর্কসংকেত। এসব লক্ষণ শনাক্ত করতে আন্তর্জাতিকভাবে ‘BE FAST’ পদ্ধতি মনে রাখা সহজ:
Balance (ভারসাম্য): হঠাৎ হাঁটার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা।
Eyes (চোখ): চোখে ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিশক্তির হঠাৎ পরিবর্তন।
Face (মুখ): মুখ একপাশে বেঁকে যাওয়া।
Arms (হাত): হাত বা পা দুর্বল হয়ে আসা।
Speech (কথা): কথা জড়িয়ে যাওয়া বা বুঝতে সমস্যা।
Time (সময়): যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত সাহায্য বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
উপসর্গ কিছুক্ষণ পর ভালো হয়ে গেলেও অবহেলা করা যাবে না। কারণ, এটি হতে পারে ‘ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক অ্যাটাক’ বা টিআইএ, যা ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের সতর্কবাণী। এসব লক্ষণের যেকোনো একটি দেখা দিলেই জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
স্ট্রোক থেকে বাঁচতে কী করবেন?
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে প্রথমেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন এবং উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন। রক্তচাপ স্বাভাবিক হলেও নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করবেন না।
খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মাছ ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। অতিরিক্ত লবণ, ভাজাপোড়া, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমিয়ে আনুন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক মোট লবণ গ্রহণ পাঁচ গ্রামের কম হওয়া উচিত। রান্নার লবণের পাশাপাশি আচার, চিপস ও চানাচুরের মতো খাবারের লবণও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।
নিয়মিত ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম, যেমন— দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতার কাটা, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে পাঁচ দিন হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকাও এড়িয়ে চলুন।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য সম্পূর্ণ পরিহার করুন। অন্যের ধূমপানের ধোঁয়া থেকেও দূরে থাকুন। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, হৃদরোগ ও অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। শরীরের ওজন ঠিক রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পরিবারে স্ট্রোকের ইতিহাস থাকলে বা একাধিক ঝুঁকির কারণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আরও জরুরি।
স্ট্রোক হলে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত স্ট্রোক চিকিৎসার সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে নিতে হবে। জরুরি সহায়তার জন্য ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যেতে পারে। লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে অথবা রোগীকে শেষ কখন স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গেছে, সেই সময়টি মনে রাখা জরুরি।
কিছু ইসকেমিক স্ট্রোকের রোগীকে লক্ষণ শুরুর সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে রক্ত জমাট গলানোর বিশেষ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। নির্দিষ্ট কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষার ভিত্তিতে আরও দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও বিশেষ চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে।
রোগীকে জোর করে খাবার, পানি বা ওষুধ খাওয়ানো যাবে না। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া অ্যাসপিরিন দেওয়াও বিপজ্জনক, কারণ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ঝাড়ফুঁক, তেল মালিশ বা ঘরোয়া চিকিৎসায় সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোই সবচেয়ে জরুরি।
অনেক ক্ষেত্রে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই আজ থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলুন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন এবং স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকুন। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপই বাঁচাতে পারে জীবন, কমাতে পারে দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার ঝুঁকি।
লেখক: মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (হেলথ), রেসিডেন্ট, বিএমইউ ।



