গর্ভধারণের আগের ও পরের যত্ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গর্ভাবস্থায় নারীদেহে নানা ধরনের শারীরিক ও হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে। সেই সঙ্গে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা কমে যায়। গর্ভাবস্থায় বিশেষ যত্নের কথা জানাচ্ছেন ডা. ফারহানা মোবিন
গর্ভধারণের আগে যা করণীয়
গর্ভধারণের পরিকল্পনার আগে নারী ও পুরুষ— উভয়ের সংক্রামক ও রক্তবাহিত রোগ আছে কি না, তা পরীক্ষা করা উচিত। পাশাপাশি নারীর রক্তের হিমোগ্লোবিন, ভিটামিন ডি, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং বিলিরুবিনের মাত্রা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
গর্ভধারণের চেষ্টার সময় থেকে সন্তানের জন্মের পর অন্তত তিন মাস পর্যন্ত ফলিক অ্যাসিড খাওয়া উচিত। ফলিক অ্যাসিড ভিটামিন বি-জাতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা গর্ভের শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে অপরিহার্য।
আগের সন্তানের ডাউন সিনড্রোম, ঠোঁট বা তালু কাটা, অতিরিক্ত বা জোড়া আঙুল অথবা কোনো জন্মগত বা বংশগত রক্তরোগ থাকলে পরবর্তী গর্ভধারণের পরিকল্পনার শুরু থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হৃদরোগ, হার্টের অপারেশনের ইতিহাস, অতিরিক্ত ওজন বা কম ওজন, কিডনির জটিলতা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, হাইপোথাইরয়েডিজম, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, লিভারের রোগ, কেমোথেরাপির ইতিহাস কিংবা আগে গর্ভপাত বা গর্ভপাত করানোর ইতিহাস থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
আগে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম হয়ে থাকলে পরবর্তী গর্ভধারণের মধ্যে দেড় থেকে দুই বছরের বিরতি রাখা ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, পরপর দুটি সিজারিয়ানের মধ্যে অন্তত দুই বছরের ব্যবধান থাকলে জরায়ুর কাটা স্থান ভালোভাবে সেরে ওঠার সুযোগ পায়।
গর্ভধারণের পর করণীয়
আগে থেকেই কোনো রোগ থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে।
গর্ভাবস্থায় অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ ভ্রমণ, উঁচু হিলের জুতা এবং অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ফাস্টফুড এড়িয়ে চলতে হবে। প্রতিদিন বিভিন্ন রঙের শাকসবজি ও ফল খেলে শরীরে প্রয়োজনীয় নানা ধরনের পুষ্টি উপাদান সরবরাহ হয়।
ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন ঝুঁকিপূর্ণ।
গর্ভধারণের শুরু থেকেই একজন স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত। নিয়মিত ফলোআপ সম্ভব না হলেও অন্তত চারবার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় নতুন কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
গর্ভধারণের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের ওষুধ সেবন করে থাকলে অবশ্যই চিকিৎসককে জানাতে হবে। কারণ, সব ধরনের ওষুধ গর্ভাবস্থায় নিরাপদ নয়।
দীর্ঘ সময় একটানা দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ না করে মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া উচিত। এটি কোমর ও তলপেটের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
নিয়মিত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো, বাসার হালকা কাজ করা, দৈনিক দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করতে হবে। চুলে নিয়মিত ডাই করা বা অতিরিক্ত কেমিক্যাল বাদ দেওয়াই উত্তম।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিটি, কভিড-১৯, রুবেলার টিকা নিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে নিজে থেকে কোনো ওষুধ বা টিকা গ্রহণ নিরাপদ নয়।
নিয়মিত নখ কাটতে হবে। চুল, দাঁত, পোশাকসহ বাসা যতটা সম্ভব পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
আগের গর্ভাবস্থায় রক্তপাত, খিঁচুনি, অপরিণত শিশুর জন্ম, গর্ভফুল নিচের দিকে অবস্থান এবং অকালে পানি ভেঙে যাওয়ার ইতিহাস থাকলে পরের গর্ভাবস্থায় বাড়তি সচেতনতা জরুরি।
হঠাৎ মাথায় ভয়ানক ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, অতিরিক্ত বমি, পেটে সন্তানের নড়াচড়া বুঝতে না পারলে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে যেতে হবে।
লেখক: মেডিকেল কর্মকর্তা, ম্যালিয়াস ইএনটি স্পেশালাইজড হসপিটাল লিমিটেড, ঢাকা




