ডেঙ্গু জ্বর সতর্ক হোন এখনই

মডেল: সামিয়া পারভীন ও ইকরা। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু সংক্রমণের হার বাড়তে থাকে। ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি ও এর প্রতিকার নিয়ে জানাচ্ছেন মেডিসিন লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. রেজাউল করিম
ডেঙ্গু জ্বর কী এবং কেন হয়?
ডেঙ্গু মূলত একটি ভাইরাসজনিত জ্বর। এই রোগ ছড়ানোর পেছনে কাজ করে ডেঙ্গু ভাইরাস। তবে এই ভাইরাস নিজে নিজে মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে না; এর জন্য প্রয়োজন হয় বাহকের। আর এর প্রধান বাহক হলো স্ত্রী এডিস ইজিপ্টি মশা। এ ছাড়া এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার মাধ্যমেও ডেঙ্গু রোগ ছড়াতে পারে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাধারণ মশা কামড়ালে সেই মশা ভাইরাস বহন করতে পারে। পরে ওই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে তার শরীরেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রোগীর চিকিৎসাই নয়; মশার বিস্তার রোধ করাও জরুরি।
ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ
সাধারণত ডেঙ্গুবাহী মশার কামড়ের ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় সাধারণ ভাইরাস জ্বরের সঙ্গে ডেঙ্গুর লক্ষণের মিল থাকায় শুরুতেই বিষয়টি বোঝা কঠিন হয়। তবে কয়েকটি লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে।
- তীব্র জ্বর: ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ খুব বেশি জ্বর আসা। সাধারণত ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর হতে পারে।
- মাথা ও চোখে ব্যথা: জ্বরের সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যথা হয়, বিশেষ করে চোখের পেছনের অংশে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
- শরীরে ব্যথা: ডেঙ্গু জ্বরকে অনেক সময় ‘হাড়ভাঙা জ্বর’ও বলা হয়। কারণ, এতে হাড়, মাংসপেশি ও জয়েন্টে বা গিঁটে তীব্র ব্যথা হয়।
- র্যাশ: আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে লাল রঙের চাকা বা র্যাশ দেখা দিতে পারে।
- অন্যান্য উপসর্গ: বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, খাবারে অরুচি এবং শরীর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়া ডেঙ্গুর অন্যতম লক্ষণ।
কখন হাসপাতালে যেতে হবে
ডেঙ্গু জ্বরে কিছু লক্ষণকে বিপদসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে। যেমন—
- যদি রোগীর বারবার বমি হতে থাকে।
- পেটে প্রচণ্ড বা তীব্র ব্যথা হলে।
- মাড়ি, নাক কিংবা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তক্ষরণ হলে।
- রোগীর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে।
- রোগী যদি অতিরিক্ত বা চরম দুর্বলতা অনুভব করেন।
আসল বিপদ কখন
অনেকেই মনে করেন, জ্বর কমে গেলেই ডেঙ্গু ভালো হয়ে যায়। কিন্তু ডেঙ্গুর আসল বিপদ শুরু হয় জ্বর কমে যাওয়ার পর। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ বা সংকটপূর্ণ পর্যায় শুরু হয়। ডেঙ্গুর সবচেয়ে গুরুতর রূপ হলো ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার’। এতে শরীরের রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে রক্তের অনুচক্রিকা বা প্লাটিলেট গুরুতরভাবে কমে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তপাত শুরু হয়। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে— মাড়ি বা নাক থেকে রক্ত পড়া, ত্বকের নিচে রক্ত জমে লাল ছোপ ছোপ দাগ হওয়া এবং বমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
জ্বর কমার তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ পর্যায় শুরু হয়। তবে ডেঙ্গুর সবচেয়ে গুরুতর রূপ হলো ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার’
এর চেয়েও ভয়াবহ হলো ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’। এতে রোগীর রক্তচাপ বা ব্লাডপ্রেশার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে এবং হৃৎস্পন্দন দ্রুত হলেও তা দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে।
শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি
ডেঙ্গু সঠিক সময়ে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের স্থায়ী বা সাময়িক ক্ষতি করতে পারে:
- লিভারের ক্ষতি: ডেঙ্গুর কারণে লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে এবং রক্তে লিভার এনজাইমের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।
- মস্তিষ্কের ক্ষতি: ভাইরাসের প্রভাবে মস্তিষ্কে জটিলতা তৈরি হয়ে রোগীর খিঁচুনি হতে পারে এবং পুরোপুরি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন।
- হার্টের ক্ষতি: ডেঙ্গুর কারণে হৃদযন্ত্র বা হার্টের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।
- কিডনি বিকল: শরীরের ভেতরের তরলের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে কিডনি বিকল বা অকেজো হয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও প্রতিকারে করণীয়
যেহেতু ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা ওষুধ নেই, তাই এই রোগ থেকে বাঁচতে প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। এর জন্য আমাদের নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে:
- এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে। তাই বাড়ির ছাদ, বারান্দা ও আঙিনায় যাতে কোনোভাবেই পানি জমতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
- ফুলের টব, টায়ার, ডাবের খোসা, ভাঙা প্লাস্টিকের পাত্র অথবা যেকোনো ধরনের পাত্রে জমা থাকা পরিষ্কার পানি তিন দিনে অন্তত একবার ফেলে দিয়ে পাত্রটি পরিষ্কার করতে হবে।
- দিনে কিংবা রাতে— যখনই ঘুমানো হোক না কেন, অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
- মশার কামড় থেকে বাঁচতে শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে থাকে এমন পোশাক পরার চেষ্টা করতে হবে।
লেখক: এমবিবিএস বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফ সি পি এস (মেডিসিন), এমডি (হেপাটোলজি), কনসালটেন্ট পার্লামেন্ট মেডিকেল সেন্টার, ঢাকা।




