মনের অদৃশ্য ক্ষত বিষণ্নতা

সোনিয়া (ছদ্মনাম), বয়স ২৫ বছর। পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছে দুই বছর। বিয়ের আগে স্বামীর সঙ্গে খুব বেশি চেনাজানার সুযোগ হয়নি। বিয়ের পর সংসারে মনোমালিন্য হলে স্বামী কথা বলা বন্ধ করে দেন। কথা বললেও শুধু দোষ ধরেন। সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগও হয় না। শ্বশুরবাড়ি ও নিজের পরিবারের মানুষজন তাকে মানিয়ে নিতে বলেন এবং আশ্বাস দেন, একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে।
সমাধানহীন এ পরিস্থিতির চাপে সোনিয়া নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন। মনে হতে থাকে, দোষ তার একারই। সংসারের প্রতিটি কাজে তার অনাগ্রহ তৈরি হয়, স্বামী ও কাছের মানুষের সঙ্গে তৈরি হয় অদৃশ্য এক দেয়াল। সোনিয়ার এই মন খারাপই বিষণ্ণতার লক্ষণ।
বিষণ্ণতা কেন হয়
বিষণ্ণতা কোনো নির্দিষ্ট কারণে হয় না। এর পেছনে কাজ করে জৈবিক, মানসিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন প্রভাব।
জৈবিক কারণ: বংশগত বা জেনেটিক প্রবণতা, মস্তিষ্কের কিছু নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যকারিতায় পরিবর্তন, হরমোনের পরিবর্তন, যেমন— থাইরয়েড সমস্যা, গর্ভাবস্থা বা প্রসব-পরবর্তী সময়। দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এর কারণ হতে পারে।
মানসিক কারণ: প্রিয়জন হারানো, অতিরিক্ত শোক, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, দীর্ঘদিনের দাম্পত্য সমস্যা ও মানসিক চাপ, চাকরি হারানো, আর্থিক সমস্যা, একাকিত্ব বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, হঠাৎ বড় ধরনের ব্যর্থতা বা হতাশা এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক দ্বন্দ্ব বিষণ্ণতার কারণ হতে পারে। শৈশবের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা, বুলিং, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, বারবার তুলনা করা, প্রত্যাশার চাপ, অবহেলা ও অতিরিক্ত সমালোচনাও এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
অন্যান্য কারণ: দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তি এবং বিভিন্ন মানসিক রোগ, যেমন— ওসিডি, সিজোফ্রেনিয়া ও প্যানিক অ্যাটাক থেকেও বিষণ্ণতা হতে পারে।
বিষণ্ণতার লক্ষণ
· কমপক্ষে দুই সপ্তাহ বা ১৪ দিন ধরে মন খারাপ থাকা, অসহায় বোধ করা ও নিজেকে ছোট মনে হওয়া;
· দুই সপ্তাহ একনাগাড়ে বেশিরভাগ সময় কোনো বিষয়ে আগ্রহ না পাওয়া;
· খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়া, ঘুম কম হওয়া বা বেশি হওয়া;
· ক্ষুধামান্দ্য অথবা অতিরিক্ত খাবার খাওয়া;
· মেজাজ খিটখিটে হওয়া ও রাগ বেড়ে যাওয়া;
· মনোযোগ কমে যাওয়া এবং কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা;
· আত্মহত্যার প্রবণতা, আশাহীনতা এবং ‘আমি কেন বেঁচে আছি’ ধরনের চিন্তা হওয়া, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া;
· দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকা, কোনো কাজ না করা, কাজে অনুপ্রেরণা ও উৎসাহের অভাব;
· সিদ্ধান্ত নিতে না পারা বা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া।
করণীয়
বিষণ্ণতাকে হালকাভাবে না দেখে সাইকিয়াট্রিস্ট, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টের সহায়তা নিন।
নিজেকে বিষণ্ণতা থেকে কাটিয়ে উঠতে ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করুন। দৈনন্দিন কাজগুলো একসঙ্গে না করে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করুন। নিজের যত্ন নিন। নিজের পছন্দের কাজ করুন, কারও সঙ্গে কথা বলুন, গাছের পরিচর্যা করা কিংবা বই পড়ার মতো কাজ করতে পারেন।
সময়মতো খাওয়া ও ঘুম সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন। পাঁচটি জিনিস দেখুন, চারটি জিনিস স্পর্শ করুন, তিনটি জিনিসের শব্দ শুনুন, দুটি জিনিসের গন্ধ নিন এবং একটি জিনিসের স্বাদ নিন।
প্রয়োজন হলে সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্ট বা সাইকোথেরাপিস্টের পরামর্শ নিন।
লেখক: লিড সাইকো সোশ্যাল কাউন্সেলর মনের বন্ধু



