অ্যালার্জিক রাইনাইটিস প্রতিকার ও সচেতনতা

ধুলোবালি, ঠান্ডা আবহাওয়া কিংবা নির্দিষ্ট কোনো খাবারের প্রতি শরীরের অতি সংবেদনশীলতাই অ্যালার্জি। এটি প্রাণঘাতী রোগ না হলেও এর লক্ষণগুলো জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে খাদ্যের অ্যালার্জি বেশি দেখা গেলেও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে শ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকা অ্যালার্জেনের প্রভাবে ‘অ্যালার্জিক রাইনাইটিস’ বা নাকের অ্যালার্জি বেশি দেখা দেয়।
অ্যালার্জি কেন ও কীভাবে হয়?
আমাদের চারপাশে বাতাসে মিশে থাকা অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী বস্তুকে বলা হয় অ্যালার্জেন। মাইট, পুরনো বইপত্র বা পত্রিকার ধুলো, কসমেটিকস, ফুলের রেণু, পশুপাখির লোম, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানার ধোঁয়া বা সিগারেটের ধোঁয়া— এসবই অ্যালার্জেন হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া ইলিশ, বোয়াল, চিংড়ি মাছ, বেগুন বা হাঁসের ডিম অনেকের জন্য অ্যালার্জির কারণ হতে পারে।
অ্যালার্জিক রাইনাইটিস হওয়ার পেছনে একটি জৈবিক প্রক্রিয়া কাজ করে। যখন একজন অ্যালার্জিপ্রবণ ব্যক্তি অ্যালার্জেনের সংস্পর্শে আসেন, তখন তার রক্তে আইজি-ই (IgE) নামক উপাদানের মাত্রা বেড়ে যায়। এটি নাকের ভেতরের মাস্ট সেল নামক কোষকে ভেঙে রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে, যা নাকে প্রদাহ ও হাঁচির উদ্রেক ঘটায়। এ ছাড়া বংশগতভাবেও এই রোগ ছড়াতে পারে; মা-বাবার অ্যালার্জি থাকলে সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে।
লক্ষণ শনাক্ত করা
নাক চুলকানো, একনাগাড়ে হাঁচি দেওয়া, নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়া এবং নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের প্রধান লক্ষণ। অনেক সময় এর সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখ জ্বলা বা চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদি আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে নাসারন্ধ্রের পাশের মাংসপিণ্ড বা ইনফিরিয়র টারবিনেট ফুলে বড় হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া নাকে কালো দাগ হওয়া বা দীর্ঘদিনের গন্ধে কোনো কিছু অনুভব করতে না পারা এর অন্যতম লক্ষণ।
প্রতিরোধ ও সতর্কতা
অ্যালার্জি প্রতিরোধের প্রথম ও প্রধান উপায় হলো অ্যালার্জেন বা অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী বস্তুগুলো চিহ্নিত করে এড়িয়ে চলা। ধুলোবালি এড়িয়ে চলতে ঘরের পর্দা, বিছানার চাদর ও আসবাব নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন। রাস্তায় বের হওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করুন। পশুপাখির লোমে অ্যালার্জি থাকলে তাদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন। ব্যক্তিগত সচেতনতাই এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
চিকিৎসা ও করণীয়
অ্যালার্জিক রাইনাইটিস অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ, সঠিক চিকিৎসা না হলে এখান থেকে হাঁপানি বা অ্যাজমা, সাইনোসাইটিস কিংবা নাকের পলিপের মতো জটিল সমস্যা তৈরি হতে পারে।
অ্যালার্জিক রাইনাইটিস নিশ্চিত করতে সাধারণত প্রিক টেস্ট নামে একটি পরীক্ষা করা হয়। কারও চামড়ায় সুঁই ফোটানোর ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে যদি সেখানে একটি ঘনীভূত চাকা দেখা যায়, তাহলে দেহে অ্যালার্জির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। এ ছাড়া যেহেতু এটি একটি আইজিই (ইমিউনোগ্লোবিউলিন) নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া, রক্ত পরীক্ষায় যদি আইজিইর পরিমাণ বেড়ে যায়, সে ক্ষেত্রেও অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। অর্থাৎ, উপযুক্ত চিকিৎসা প্রক্রিয়া নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা ও সমন্বিত ফলাফল বিশ্লেষণ করা খুবই জরুরি।
চিকিৎসার প্রথম ধাপ হিসেবে অ্যালার্জেন এড়িয়ে চলার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শে উপসর্গ অনুযায়ী অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ, মন্টেলুকাস্ট ট্যাবলেট, মাস্ট সেল স্টেবিলাইজার এবং নাকের স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে স্টেরয়েড জাতীয় নাকের স্প্রে কিনে ব্যবহার করবেন না। দীর্ঘমেয়াদি বা ভুল ব্যবহারের ফলে নাকের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। ওষুধে সুফল না মিললে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা প্রয়োজনে ইলেকট্রোক্যাটারাইজেশন ও ভিডিয়ান নিউরেক্টমি, ক্ষেত্রবিশেষে পলিপেক্টমির মতো অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিতে পারেন। সচেতনতা ও নিয়মানুবর্তিতা অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় সহায়ক। ঘরোয়া পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে সঠিক চিকিৎসা নিলে এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এস (ইএনটি)
গবেষণা কর্মকর্তা, জাতীয় নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউট, তেজগাঁও, ঢাকা



