প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচুন

ছবি: মহুবার রহমান
হিট স্ট্রোক কী
অতিরিক্ত গরমে আমাদের শরীরে মূলত দুই ধরনের বড় সমস্যা দেখা দেয়। একটি হলো হিট এক্সহশন এবং অন্যটি হলো হিট স্ট্রোক। এই দুটি সমস্যা আসলে একটির সঙ্গে অন্যটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
হিট এক্সহশন: এটি মূলত হিট স্ট্রোকের আগের প্রাথমিক ধাপ। প্রচণ্ড গরমে যখন শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের হয়ে যায়, তখন এই অবস্থা তৈরি হয়। এ সময় মানুষ খুব দুর্বল ও ক্লান্ত বোধ করে। শরীর একেবারেই অবসন্ন লাগে এবং মানুষ তার কাজের স্বাভাবিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। এর পাশাপাশি মানুষের মনে তৈরি হয় প্রচণ্ড অস্বস্তি। অনেকে খিটখিটে হয়ে পড়েন। অনেকক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে থাকলে মাথা ঘোরার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
হিট স্ট্রোক: হিট এক্সহশনের সময় সঠিক ব্যবস্থা না নিলে রোগী দ্রুত হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এটি একটি জরুরি ও মারাত্মক চিকিৎসা পরিস্থিতি। এ অবস্থায় শরীরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে মানুষ। রোগী হঠাৎ করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। রক্তচাপ এবং পালস রেট দ্রুত ওঠানামা করতে শুরু করে। কেউ কেউ চোখে ধাঁধা দেখেন, তার আচরণেও দেখা দেয় নানারকম অসংগতি। এই অবস্থায় রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা না দিলে জীবনহানির আশঙ্কা প্রবল।
গরমের তীব্রতা শুধু দৈনন্দিন অস্বস্তি বাড়ায় না, তৈরি করে নানা রকম গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। একটু অসচেতনতার কারণে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় দুর্ঘটনা। তেষ্টা পেলে পানি পান, তীব্র গরমে মুখে পানির ঝাপটা দেওয়া কিংবা স্যালাইন খাওয়ার মতো সাধারণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে সহজ সমাধান। ছাতিফাটা এসব দিনে সুস্থ ও নিরাপদ থাকতে মানতে হয় কিছু নিয়ম। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নিলে এই গরম হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী। বিশেষ করে হিট স্ট্রোক এক্ষেত্রে তৈরি করতে পারে বড় ঝুঁকি।
তাৎক্ষণিকভাবে করণীয়
কেউ গরমে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে লক্ষণ বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। হিট এক্সহশনের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা মাত্র রোগীকে দ্রুত কড়া রোদ থেকে সরিয়ে নিতে হবে। তাকে কোনো ছায়াযুক্ত বা ঠান্ডা স্থানে নিয়ে গিয়ে বাতাসে রাখতে হবে। তারপর ঠান্ডা পানি দিয়ে গা ভালো করে মুছে দিতে হবে। এতে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে আসে। এ সময় রোগীকে প্রচুর পরিমাণে ওরাল স্যালাইন, ডাবের পানি বা লেবুর শরবত খাওয়াতে হবে। লবণযুক্ত তরল খাবার এ সময়ে শরীরে খনিজের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করে।
রোগী যদি হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে দ্রুততম সময়ে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে রোগীর শরীরে স্যালাইনের মাধ্যমে তরল ও লবণের ঘাটতি পূরণ করা হয়। রোগীর শ্বাসকষ্ট দূর করতে প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন দেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা রোগীর শারীরিক অসুবিধা বুঝে তাৎক্ষণিক অন্যান্য ব্যবস্থা নেন। দ্রুত ব্যবস্থা নিলে এ অবস্থা থেকেও রোগীকে বাঁচানো সম্ভব।
দীর্ঘমেয়াদি রোগে বাড়তি সতর্কতা
প্রচণ্ড গরমে সাধারণ মানুষের চেয়ে কিছু মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ খান এবং যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন। গরমে তাদের জন্য সচেতনতা খুবই জরুরি।
বিশেষ ওষুধের ব্যবহারকারী: উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের কিছু ওষুধ শরীর থেকে দ্রুত পানি বের করে দেয়। যেমন ফ্রুসেমাইড জাতীয় মূত্রবর্ধক ওষুধ প্রস্রাব বাড়িয়ে দেয়। আবার ডায়াবেটিসের কিছু নতুন ওষুধও (যেমন এমপাগ্লিফ্লোজিন) শরীর থেকে পানি ও লবণ দূর করে। যারা নিয়মিত এসব ওষুধ খান, তারা কড়া রোদে গেলে সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি পানি খাবেন। এ সময় বারবার লবণযুক্ত লিকুইড খাবার খাওয়া উচিত।
কিডনি রোগী: কিডনি রোগীদের পানি পানের পরিমাপ একেবারেই নির্দিষ্ট। তাই তারা গরমের এই চরম আবহাওয়া যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলবেন। কড়া রোদে একদমই বের হবেন না। গরমে শরীর খারাপ লাগলে নিজে নিজে অতিরিক্ত পানি বা স্যালাইন খাবেন না। যেকোনো শারীরিক সমস্যায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। চিকিৎসক অবস্থা বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত দেবেন।
ডায়াবেটিস রোগী: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শরীর থেকে এমনিতেই বেশি পানি বের হয়ে যায়। এর ওপর গরমে অতিরিক্ত ঘাম হলে শরীর দ্রুত ডিহাইড্রেটেড হয়ে পড়ে। তাই ডায়াবেটিস রোগীরা যদি অতিরিক্ত তৃষ্ণার্ত বা ক্লান্ত বোধ করেন, তবে দ্রুত সতর্ক হওয়া দরকার। প্রাথমিক উপশম হিসেবে তারা একটু স্যালাইন পানি খেতে পারেন। তবে ঘরে বসে না থেকে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল





