বিভক্তির দেয়াল ভেঙে সাকুরার জাদু
- জার্মানির ছোট-বড় নানান শহর ও পার্কে চেরি ব্লসম অ্যাভিনিউ আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং লম্বা চেরি ব্লসম অ্যাভিনিউটি বার্লিন-ব্র্যান্ডেনবার্গ অঞ্চলের টেল্টো নামক একটি ছোট্ট শহরের কাছে। অসাধারণ সুন্দর ও জার্মানির পুনরেকত্রীকরণের স্মৃতিমাখা এই চেরি পথের গল্প শুনিয়েছেন সৌরভ মাহমুদ

দুই জার্মানি এক হওয়ার স্মৃতিমাখা টেল্টো অঞ্চলের এই চেরি পথ - ছবি: লেখক
জার্মানিতে এখন বসন্ত। চারদিকে বুনো ফুলের সমারোহ। জার্মানিতে ঋতু ছয়টি নয়; চারটি— গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত ও বসন্ত। সবচেয়ে সুন্দর বসন্ত ও শরৎ। এ দুটি ঋতুই আমার কাছে খুব প্রিয় দুটি ভিন্ন আঙ্গিকের সৌন্দর্যের জন্য। শরৎ সাজে হলুদ পাতায়, বিশেষ করে ম্যাপল, লাইম, পপলার, বার্চ ইত্যাদি। বসন্তে নানান প্রজাতির বুনো ফুলে ভরে ওঠে মাঠ, পার্ক, প্রান্তর ও বনতল। দীর্ঘ বিবর্ণ শীতের পরে বসন্তে অনেক প্রজাতির চেরি ফুলের রঙ মানুষের মনে নিয়ে আসে আনন্দ। হাইকিং করতে বের হয়। ভিড় জমায় ম্যাগনোলিয়া ও চেরির বাগানে।
জার্মানির ছোট-বড় নানান শহর ও পার্কে চেরি ব্লসম অ্যাভিনিউ আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং লম্বা চেরি ব্লসম অ্যাভিনিউটি বার্লিন-ব্র্যান্ডেনবার্গ অঞ্চলের টেল্টো নামক একটি ছোট্ট শহরের কাছে। গত বসন্তে নেদারল্যান্ডসের গ্রয়িংগেন শহরে সুন্দর এক চেরিবীথি দেখেছিলাম মুগ্ধ চোখে। এ বছর বসন্তের শুরুতেই চেরি ও ম্যাগনোলিয়া ফুলের সমারোহ দেখার জন্য গিয়েছি ভিয়েনার বিখ্যাত সিতাগায়া জাপানিজ গার্ডেন ও সালজবুর্গ শহরে। ম্যাগনোলিয়ার রূপে যখন মজে আছি, তখনই জানতে পারলাম জার্মানির সবচেয়ে বিখ্যাত চেরিবীথির কথা। যে শহরে থাকি, সেখান থেকে দুই ঘণ্টা ড্রাইভ; খুব বেশি দূরে নয়। এপ্রিলে অফিস ছুটির দিনে খুব সকালে বের হয়ে পড়লাম। সঙ্গে নিলাম আমার ব্রমটন ফোল্ডিং বাইসাইকেল। এই বাগানের পাশে সুন্দর সাইক্লিং করার রাস্তাও আছে। ২৬ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টায় পৌঁছালাম টেল্টো শহরে। সুন্দর, নিরিবিলি। অনেকেই সাইকেল চালাচ্ছে। চকচকে নীল আকাশ, আরামদায়ক রোদ এবং বসন্তের নির্মল বাতাস মিলিয়ে দিনটি ভারি চমৎকার। প্রায় দুই কিলোমিটার ধরে সারি সারি চেরিগাছ।
পর্যটকের কেউ গাছের তলায় চাদর বিছিয়ে বসে আছে কেউ বাচ্চাদের নিয়ে ছবি তুলছে চেরি ফুলের সঙ্গে
পর্যটকের কেউ গাছের তলায় চাদর বিছিয়ে বসে আছে, কেউ ঘুমাচ্ছে; কেউ বাচ্চাদের নিয়ে ছবি তুলছে চেরি ফুলের সঙ্গে। অনেক নারী পর্যটক এসেছে গোলাপি রঙের পোশাক পরে। কিছু মানুষ এসেছে একদম জাপানি পোশাকে, তাদের মতো সেজে। একটি চেরিগাছতলায় তারা আসর বসিয়েছে। তাদের দুপুরের খাবারের আইটেম, খাওয়ার পাত্র সবকিছুতেই জাপানের সংস্কৃতি। অথচ তারা জার্মান। মূলত এই চেরি ফুলের আবেদনই তাদের উৎসবের কারণ।
জার্মানির টেল্টো অঞ্চলের এই বিখ্যাত পথটি পরিচিত ‘টিভি আসাহি চেরি ব্লসম অ্যাভিনিউ’ নামে। প্রতিবছর এপ্রিলের মাঝামাঝি এখানে চেরি ফুল ফুটতে শুরু করে। প্রায় তিন সপ্তাহ পুরো এলাকা ঢেকে যায় গোলাপি-সাদা পাপড়ির জাদুতে।
টেল্টো (ব্র্যান্ডেনবার্গ) আর লিশটারফেল্ডের (বার্লিন) মাঝখানে, বার্লিন ওয়ালের পুরনো সীমান্তঘেঁষা এই পথে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০ জাপানি চেরিগাছ। গাছগুলোর বোটানিক্যাল নাম পুরুনাস সেরুলাটা, যাকে আমরা জাপানি সাকুরা নামেই বেশি চিনি।
প্রতি বছর এপ্রিলের মাঝামাঝি এখানে চেরি ফুল ফুটতে শুরু করে। প্রায় তিন সপ্তাহ পুরো এলাকা ঢেকে যায় গোলাপি-সাদা পাপড়ির জাদুতে
কিন্তু এই সৌন্দর্যের পেছনে আছে ইতিহাসের গভীর আবেগও। ১৯৯০ সালে বার্লিন প্রাচীর ভাঙার পর জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ উদযাপনে জাপানের টিভি স্টেশন টিভি আসাহি একটি তহবিল সংগ্রহ অভিযান শুরু করে। সাধারণ মানুষের অনুদানে জমা হয় প্রায় ১৪ কোটি ইয়েন। সেই অর্থে বার্লিন ও ব্র্যান্ডেনবার্গ জুড়ে লাগানো হয় ৯ হাজারের বেশি চেরিগাছ। এর মধ্যে ১ হাজার ১০০টি রোপণ করা হয় এই প্রাক্তন সীমান্ত অঞ্চলে
একসময় যেখানে ছিল কংক্রিটের দেয়াল, কাঁটাতার আর ওয়াচটাওয়ার— আজ সেখানে ফুটে থাকে শান্তির প্রতীক সাকুরা। জাপানি সংস্কৃতিতে চেরি ফুল মানে নতুন শুরু, শান্তি আর ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের উদযাপন। তাই এই পথ শুধু ফুল দেখার জায়গা নয়; এটি যেন বিভক্ত অতীত থেকে মিলনের ভবিষ্যতের এক জীবন্ত স্মারক।
প্রতিবছর এখানে অনুষ্ঠিত হয় জাপানি ঐতিহ্যবাহী ‘হানামি’ উৎসব, অর্থাৎ ফুল দেখার উৎসব। মানুষ তখন শুধু চেরি ফুলই দেখতে আসে না; আসে বসন্তের উষ্ণতা আর প্রকৃতির নবজাগরণ অনুভব করতে। এই স্থানে প্রথম হানামি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০২ সালের ৫ মে। তার পর থেকে প্রতি বসন্তেই হাজারো মানুষ ভিড় করেন এই গোলাপি স্বপ্নপথে।






