রাইফেলের নলে ফুলের বিপ্লব

২৫ এপ্রিল পর্তুগালের ‘ফ্রিডম ডে’। এ বিশেষ দিন উদযাপনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা জানালেন প্রবাসী বাংলাদেশী ছাত্র হুমায়ূন আহমেদ শ্রাবণ
রাইফেলের নলের ভেতর যখন রক্তলাল কার্নেশন ফুল গুঁজে দেওয়া হয়, তখন ইতিহাস তার গতিপথ বদলে ফেলতে পারে। গত বছর মাস্টার্স করতে বিদেশে আসার পর থেকেই একটা বিষয় খুব কাছ থেকে দেখছি— শিকড় থেকে আলাদা না হলে দেশের টান এমন তীব্রভাবে অনুভব করা যায় না। বিশেষ করে আমাদের জাতীয় দিবসগুলোতে এ শূন্যতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
দেশে থাকতে ১৬ ডিসেম্বর বা ২৬ মার্চ কেবলই ছুটির দিন ছিল, কিন্তু প্রবাসের একাকিত্বে বিজয় দিবসে বারবার মনে পড়ছিল ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে যাওয়ার সেই দিনগুলোর কথা। ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগের রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর প্রবাসে মনটাকে আরও বিষণ্ন ও অস্থির করে তুলেছিল। তবে আমি কখনো ভাবিনি পর্তুগালের রাজধানী শহর লিসবনের রাজপথে দাঁড়িয়ে নিজের দেশের বিজয় দিবসের সেই চিরচেনা আমেজ ভিনদেশি এক উৎসবের মাঝে এভাবে খুঁজে পাব।
গত সপ্তাহে ক্লাস ব্রেকের সময় কথা হচ্ছিল পর্তুগিজ সহপাঠী মনিকার সঙ্গে। ওর কাছে প্রথম শুনলাম তাদের ২৫ এপ্রিল পর্তুগালের ‘ফ্রিডম ডে’র কথা। মনিকার উৎসাহে সিদ্ধান্ত নিলাম দিনটিকে কাছ থেকে দেখার।
১৯৭৪ সালের ২৫ এপ্রিল পর্তুগালের সেনাবাহিনী একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৪৮ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছিল
২৫ এপ্রিল লাল টি-শার্ট পরে লিসবনের অ্যাভিনিউ দ্য লিবারদাদে পৌঁছেই আমি থমকে গেলাম। পুরো দৃশ্যটা আমার কাছে ইতিহাসের বই থেকে বের হয়ে আসা কোনো মুহূর্তের মতো লাগছিল। মিছিলের একেবারে সামনে কিছু পুরনো সামরিক ট্যাংক। তার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছেন সেই সময়কার সেনাসদস্যরা। ১৯৭৪ সালের ২৫ এপ্রিল পর্তুগালের সেনাবাহিনী একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৪৮ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে তৎকালীন শাসক মার্সেলো কােয়তানোর পতন ঘটে। সেদিন সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে সেনাদের রাইফেলের নলে লাল কার্নেশন ফুল গুঁজে দিয়েছিল।
আজ ৫২ বছর পর, ২০২৬ সালেও সেই ইতিহাসের তেজ একটুও কমেনি। সাদা চুল আর বলিষ্ঠ চাহনির প্রবীণ এ মানুষগুলোই একদিন ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছিলেন। তাদের বয়সের ভারে মুখে ভাঁজ পড়লেও, চোখের ভেতরের সেই তরুণ বিপ্লবী সত্তাটি এখনো অটুট।
মিছিলে চোখে পড়ল কিছু ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার। একটিতে ভ্লাদিমির পুতিন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রক্তমাখা পোশাক পরা অবস্থায় উপস্থাপন করা হয়েছে, যার শিরোনাম ‘বাল্লেটকিল্লা’। এটি মূলত বিশ্ব জুড়ে বাড়তে থাকা যুদ্ধ-উন্মাদনা আর স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে এক সৃজনশীল প্রতিবাদ। এ ছাড়া একটি প্ল্যাকার্ড দেখলাম, যেখানে ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী নেতাদের ছবি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে ‘ঘৃণার রাজনীতি’ সম্পর্কে। জিও-ইকোনমিকস ও বিশ্বরাজনীতি নিয়ে পড়ার সুবাদে আমি বুঝতে পারলাম, এটি শুধু একটি সাধারণ ব্যঙ্গচিত্র নয়। এটি মূলত বিশ্ব জুড়ে বাড়তে থাকা একনায়কতন্ত্র এবং ‘ওয়ার ইকোনমি’র বিরুদ্ধে পর্তুগিজদের এক তীব্র প্রতিবাদ।
পর্তুগালের মানুষ জানে স্বৈরশাসন কী, কারণ তারা অর্ধশত বছর সেটি সহ্য করেছে। তাই পৃথিবীর কোথাও যখন গণতন্ত্র সংকটে পড়ে কিংবা ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, লিসবনের রাজপথ তখন প্রতিবাদে গর্জে ওঠে।
মিছিলের মাঝপথে দেখলাম এক অভিনব প্রতিবাদ— বিশাল এক যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘এরর’ বা ‘ত্রুটি’। ক্যালকুলেটরের বোতামগুলোতে সংখ্যা নয়, বরং লেখা ছিল বর্তমান পর্তুগালের সবচেয়ে বড় কিছু সংকটের নাম— আবাসন, খাদ্য এবং স্বাস্থ্যসেবা। বর্তমানে এখানে আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় ভয়াবহ। এই ‘এরর’ ক্যালকুলেটরটি যেন রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের সরাসরি বার্তা। এটি জানান দিচ্ছে, যদি সাধারণ মানুষের মাথার ওপর ছাদ না থাকে কিংবা সুচিকিৎসা না মেলে, তবে সেই গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ।
পর্তুগালের রাজপথে লাল কার্নেশনের এ মিছিলে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করলাম, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খায়। কারণ, আমরা একে শুধু একটি সাময়িক অর্জন হিসেবে দেখি। কিন্তু পর্তুগালের মানুষের কাছে গণতন্ত্র কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রারই একটি অংশ। তারা বিশ্বাস করে, গণতন্ত্র মানে শুধু রাজপথের স্লোগান নয়; বরং এটি হলো একে অন্যকে সম্মান করা আর সবাই মিলে নিজেদের অধিকারগুলোকে আগলে রাখার এক সামাজিক দায়িত্ব।
আমাদের দেশে যখন দেখি, গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে অন্যের ওপর ‘মোরাল পুলিশিং’ করা হচ্ছে, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ‘মব জাস্টিস’-এর নামে বিচারহীনতা উৎসাহিত করা হচ্ছে, তখন লিসবনের এ উৎসবটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। অন্যের ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষা করা যে নিজেরই নাগরিক দায়িত্ব, এ বোধটুকু আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি বলেই আমাদের অর্জনগুলো বারবার হোঁচট খায়। লিসবনের এ অভিজ্ঞতা আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে, স্বাধীনতা অর্জনের পরও তাকে টিকিয়ে রাখার কাজ শেষ হয় না।



