জীবনটা সরল আর সাধারণ

ওয়াসিম সাঈদ
শৈশবে-কৈশোরে কখনো ভাবিনি বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য কোথাও থিতু হবো। প্রবাসজীবন কখনই কাঙ্ক্ষিত ছিল না। ২৫ বছর আগে যখন ঢাকা বিমানবন্দর থেকে বিমান অনন্ত নীলে তার ডানা মেলে দিল, বুকে তখন রাজ্যের হতাশা; মা-কে ছেড়ে আসার, বন্ধুদের আড্ডা ছেড়ে আসার, আর ভরদুপুরে কিংবা পড়ন্ত বিকালে কনে দেখা আলোয় প্রেয়সীকে নিয়ে রিকশায় ঘোরাঘুরি করা, কিংবা রাস্তার ওপর ফুটবল কিংবা ক্রিকেট খেলা, সব– সবকিছু ছেড়ে আসার হতাশা।
২৫ (প্রায় ২৬) বছর আগের আর এখনকার ফিনল্যান্ড একরকম নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিনল্যান্ড বদলেছে অনেকটা। যখন প্রথম আসি তখন আমার অ্যাডমিশন হয়েছিল কুওপিও শহরের এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, যা রাজধানী হেলসিংকি থেকে বেশ দূরে, ট্রেনে চার ঘণ্টার বেশি সময় লাগত। হেলসিংকি থেকে যেদিন প্রথম কুওপিও গিয়েছিলাম, সে এক ভয়ঙ্কর স্মৃতি! রাত ১১টার দিকে যখন সেখানে পৌঁছুলাম, ট্রেন থেকে নামব কি না দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম। ছোট্ট স্টেশন, চারদিকে প্রায় অন্ধকার, মুষলধারে তুষার পড়ছে, হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। মনে হলো আমি একা, ভীষণ একা! ঢাকা শহরের জনারণ্যে বেড়ে ওঠা একটি ছেলে কী করে এই নির্জনতাকে মেনে নেবে!
এখানকার জীবনটা সরল আর সাধারণ। মানুষ এখানে সত্য কথা বলে, অপরের যাপন নিয়ে ঘাঁটায় না, নিজ-সাফল্যে অহংকারী কিংবা অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয় না, রাত ২টায় একটা মেয়ে এখানে একা একা হেঁটে কিংবা বাসে করে বাড়ি ফিরতে পারে। এখানকার মন্ত্রীরা টিকিট কেটে নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়া গ্যালারিতে বসে আইসহকির কোনো জমজমাট ম্যাচ বন্ধুদের সঙ্গে উপভোগ করতে পারেন। এই যেমন ইচ্ছা করার মূলমন্ত্র’ কিন্তু একটিই— সেটি হচ্ছে মানুষের স্বাধীনতা আর মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা।
যখন ছাত্র হয়ে ফিনল্যান্ডে এসেছিলাম, সময়টা আজকের মতো ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি টুকটাক কাজ করার সুযোগ পাওয়া যেত। কাজগুলো হয়তো খুব বড় কিছু ছিল না; কিন্তু নিজের খরচ চালাতে এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে সেগুলোর গুরুত্ব ছিল অনেক। আজকের বাস্তবতা অনেক কঠিন। নতুন যারা ফিনল্যান্ডে আসছেন— বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও উচ্চশিক্ষিত অভিবাসীদের অনেকের জন্য চাকরি পাওয়া সহজ নয়। প্রতিযোগিতা বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। অনেক কাজের ক্ষেত্রেই স্থানীয় ভাষার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা অতি উচ্চমানের, তবে বিদেশিদের জন্য টিউশন ফিও অনেক। আমাদের সময় অবশ্য টিউশন ফি ছিল না। বাংলাদেশ থেকে যারা ইদানীং উচ্চশিক্ষার্থে আসছেন, তাদের প্রায় সবারই কোনো না কোনো এজেন্সিকে চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এজেন্সির গল্পের গরু গাছে চড়ে। অর্থাৎ ভুলভাল তথ্যে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এখানে পড়ালেখা শেষেও যে কাঙ্ক্ষিত কাজ পাওয়া যাবে, তার গ্যারান্টি নেই। ফিনল্যান্ডে ডিগ্রির চেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় দক্ষতাকে।
ফিনল্যান্ডে ২৫ বছরের স্মৃতিতে দাগ কেটে যাওয়া কিছু মুহূর্ত আছে। একবার আইসহকি খেলা দেখতে গিয়ে আমার পাশেই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট তারিয়া হালোনেনকে দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। জাতীয় দলেরও নয়, স্থানীয় দুটি ক্লাবের ম্যাচে একজন প্রেসিডেন্ট শুধু তার বান্ধবী অথবা আত্মীয়াকে নিয়ে গ্যালারিতে গলা ফাটিয়ে নিজ দলকে উৎসাহিত করছেন— এমন দৃশ্য চলচ্চিত্রে অথবা স্বপ্নে দেখা যায় বলে জানতাম। এখানকার বাঙালি কমিউনিটি বেশ বড়। ‘প্রত্যাশা’ নামে বাঙালিদের একটি সংগঠন আছে এখানে। আমি এই সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত। সাংস্কৃতিক সংগঠনটি প্রায় ২৬ বছরের পুরনো। সংগঠকদের কাছে ‘প্রত্যাশা’ একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। কখনো কখনো ২৫ বছর আগের হতাশাগুলো আবার ফণা তুলে ওঠে। সে সবকিছু ছেড়ে আসার যাতনা বড় ভয়ঙ্কর। নিজেকে শিকড়বিহীন চিরবিদেশি বলে মনে হয়!
লেখক: সংস্কৃতিকর্মী



